ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধের দাবিতে আইনি নোটিশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধের দাবিতে আইনি নোটিশ

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জাতীয় মাছটির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদেশে ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে। এরই মধ্যে ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে স্থানীয় বাজারে ইলিশের সংকট ও উচ্চমূল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি করা ইলিশ অন্য দেশেও পুনঃরপ্তানি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এ আইনি নোটিশ পাঠান। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে সংশ্লিষ্ট পক্ষ করা হয়েছে। নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে ভারতে ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বা নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেওয়া, দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়ানো এবং সাধারণ ভোক্তার জন্য দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আইনি নোটিশে ইলিশকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ এবং মূল্যবান ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইলিশ শুধু দেশের মানুষের খাদ্যতালিকার একটি জনপ্রিয় মাছ নয়, এর সঙ্গে বাংলাদেশের নদী, উপকূলীয় জীবন, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এই মাছের উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানি নিয়ে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

নোটিশে দেশের বর্তমান বাজারদরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বাজারভেদে ও মাছের আকার অনুযায়ী দামে পার্থক্য থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের জন্য ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় মাছ হিসেবে পরিচিত হলেও ক্রমবর্ধমান দাম সাধারণ ভোক্তাদের কাছে ইলিশকে অনেকটা বিলাসী খাদ্যপণ্যে পরিণত করছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইলিশের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। মাছের প্রাপ্যতা, মৌসুমি উৎপাদন, নদী ও সাগরে আহরণের পরিস্থিতি, সংরক্ষণব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয়, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব বাজারদামে পড়তে পারে। ফলে শুধু রপ্তানি বন্ধ করলেই দাম স্বাভাবিক হবে কি না, সেটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে আইনি নোটিশে রপ্তানি কমানো বা বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নোটিশে অতীতে স্থানীয় বাজারে সংকট ও উচ্চমূল্য থাকার সময়ও তুলনামূলক কম দামে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আইনজীবীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশের ভোক্তাদের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা না করে রপ্তানিমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উৎসব বা বিশেষ মৌসুমে ইলিশের চাহিদা বাড়লে সীমিত সরবরাহের পরিস্থিতিতে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আইনি নোটিশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, ভারতের কিছু আমদানিকারক বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি করে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তা পুনঃরপ্তানি করে থাকতে পারেন। এর মাধ্যমে আমদানিকারকেরা বেশি মুনাফা অর্জন করলেও বাংলাদেশ সেই অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে নোটিশে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি নোটিশে উত্থাপিত একটি অভিযোগ; বিষয়টির প্রকৃত পরিধি ও আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নথি ও সরকারি তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য ইলিশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মূল্যও কম নয়। দেশের নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত এই মাছ বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশের উচ্চমূল্যের কারণে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সহনীয় দাম নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়—এই দুই স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই নীতিনির্ধারকদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

আইনি নোটিশে সরাসরি ভারতে রপ্তানি বন্ধের দাবি জানানো হলেও এর পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি নীতির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইলিশ রপ্তানির একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত মূল্য থেকে বেশি সুবিধা পেতে পারেন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বাড়তে পারে বলে নোটিশে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

ইলিশের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। জেলেদের কাছ থেকে মাছ সংগ্রহের পর একাধিক ধাপে হাতবদলের ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জেলেরা অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের আহরিত মাছের চূড়ান্ত বাজারমূল্যের তুলনায় কম অংশ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই ইলিশের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানি নীতি নয়, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নোটিশে সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ এবং জনগণের স্বার্থে তা ব্যবহারের সাংবিধানিক দায়িত্বের আলোকে ইলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ব্যবস্থাপনা করা উচিত বলে সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পরই রপ্তানির বিষয়টি বিবেচনায় আসে।

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি প্রশাসনিক পর্যায়ে সমাধান না হলে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

এদিকে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা, দেশীয় বাজারের ভোক্তা, রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী এবং সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্য—সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ ইলিশের সঙ্গে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের খাদ্য ও আবেগ জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে তেমনি নদী ও সমুদ্রনির্ভর হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা সরাসরি সম্পর্কিত। রপ্তানি সীমিত করা হলে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বন্ধ থাকলে জেলে ও ব্যবসায়ীদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ফলে সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশের বাজারে ইলিশের দাম কীভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা যায় এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কীভাবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কাজে লাগানো যায়। ভারতে রপ্তানি বন্ধের দাবি ঘিরে পাঠানো এই আইনি নোটিশ সেই বৃহত্তর নীতিগত বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনেছে। এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত