প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সারা দেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদনকারীদের তৎপরতা বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক তদবিরের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংসদ সদস্য, বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাঁদের অনুসারীদের কেউ কেউ পছন্দের প্রার্থীর জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সার ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও বিভিন্ন এলাকায় আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সার ডিলার নিয়োগের জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। বিভিন্ন শূন্য ডিলার ইউনিটে নিয়োগ দিতে আবেদন গ্রহণের পর বর্তমানে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারি নীতিমালায় আবেদন যাচাই থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ডিলার নির্বাচনের জন্য একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুপারিশের বাইরে নির্ধারিত যোগ্যতা ও যাচাই প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত নিয়োগের ভিত্তি হওয়ার কথা।
সম্প্রতি সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত নতুন সমন্বিত নীতিমালা কার্যকর করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সরকারি নীতিমালায় ডিলার নিয়োগের পাশাপাশি সার বিতরণব্যবস্থাকে আরও কাঠামোবদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে। এর আগে সংশোধিত নীতিমালাও প্রকাশ করা হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থায় আবেদন যাচাই, প্রার্থী বাছাই এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের দায়িত্ব বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নতুন ডিলার নিয়োগের বিপরীতে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এতে প্রতিটি ডিলার ইউনিটের বিপরীতে একাধিক আবেদনকারী প্রতিযোগিতা করছেন। ফলে প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদনকারীদের আনাগোনা বেড়েছে। অনেকে সরাসরি মন্ত্রী বা সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের কিংবা পছন্দের প্রার্থীর আবেদন নিয়ে কথা বলছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউও এ ধরনের সাক্ষাতে অংশ নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির নামও এসেছে, যাঁরা নিজেদের এলাকা বা পরিচিত ব্যক্তিদের সার ডিলারশিপের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বা কোনো আবেদনকারীর পক্ষে কথা বলার বিষয়টিকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিলার নিয়োগে প্রভাব বিস্তার বা বিধিবহির্ভূত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণের জন্য পৃথক যাচাই প্রয়োজন।
এদিকে বিভিন্ন এলাকায় ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ চাওয়ার অভিযোগও ছড়িয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথাও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও বা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কিছু অভিযোগ সামনে এলেও সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে যথাযথ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। কৃষি সচিব সেলিম খান বলেছেন, আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে এসেছে এবং সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দিয়ে কর্মকর্তারা আবেদনগুলো পরীক্ষা করছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে আরও কিছু সময় লাগবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। ফলে আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই ও যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রক্রিয়ার শুরুতে আবেদনগুলো যাচাই করে উপজেলা কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। এরপর জেলা পর্যায়ের কমিটি সেই প্রার্থীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রস্তাবিত তালিকা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আবেদন ও প্রার্থীদের তথ্য পরীক্ষা করে চূড়ান্ত মনোনয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা।
এই বহুস্তরীয় যাচাইব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ে আবেদন গ্রহণ ও বাছাইয়ের পর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত যাচাইয়ের সুযোগ রাখা। এর ফলে কোনো প্রার্থীকে শুধু স্থানীয় সুপারিশের ভিত্তিতে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ সীমিত করার কথা। তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্তভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে আবেদনকারী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।
সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি ব্যবস্থায় কৃষকদের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিলাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ডিলার নিয়োগে অনিয়ম হলে তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষকদের সারপ্রাপ্তি, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং বাজারব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন নীতিমালায় সার বিতরণব্যবস্থায় খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি কাঠামো অনুযায়ী ডিলারের অধিক্ষেত্রে নির্ধারিত সংখ্যক খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থাকার কথা এবং এসব কেন্দ্রের স্থান নির্বাচন সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে করার বিধান রয়েছে। এর ফলে ডিলার নিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সার বিক্রয়ব্যবস্থাকেও নতুন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিদ্যমান ডিলারদের একটি সংগঠন থেকেও আপত্তি ও নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত রাখার দাবি উঠেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে নীতিমালার কিছু বিষয় স্পষ্ট করা এবং বিদ্যমান ডিলারদের অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেদনগুলো কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং চূড়ান্ত তালিকা কোন মানদণ্ডে তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত যোগ্যতা ও মানদণ্ড অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হবে এবং যোগ্য আবেদনকারীকে নির্বাচন করা হবে। ফলে রাজনৈতিক তদবির বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি প্রশাসনিক যাচাইপ্রক্রিয়ার ফলাফলও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, আবেদনকারীদের মধ্যে কারা নির্বাচিত হয়েছেন এবং নির্ধারিত নীতিমালা কতটা অনুসরণ করা হয়েছে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ বা রাজনৈতিক যোগাযোগের ঘটনাকে চূড়ান্ত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও তদন্তের ফলের দিকে নজর দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের কাছে সার সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকাই এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রধান প্রত্যাশা।