ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা না হলেও কাউন্সিলর পদে আগেভাগেই নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম বাছাই করে তাঁদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে এখন পর্যন্ত দুই সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১২টিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম জানানো হয়েছে। বাকি ১৭টি ওয়ার্ডে যাচাই-বাছাই ও প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে।

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে আসায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন এখনো ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোটের তারিখ ঘোষণা করেনি, দলটি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রস্তুতি হিসেবে ওয়ার্ডভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং নিজ নিজ এলাকায় জনসম্পৃক্ততা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৩টিতে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৯টিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে উত্তরের ১১টি এবং দক্ষিণের ৬টি ওয়ার্ডে এখনো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। তবে যেসব নাম অভ্যন্তরীণভাবে জানানো হয়েছে, সেগুলোকে এখনো চূড়ান্ত মনোনয়ন হিসেবে বিবেচনা করছে না দলটি।

জামায়াতের নেতারা বলছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে কাজ করতে দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের সবাই দলীয় মনোনয়ন পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে প্রয়োজনে কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে বিকল্প কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমানে যাঁরা এলাকায় নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করছেন, তাঁদের কার্যক্রমকে মূলত নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটির যেসব ওয়ার্ডে এখনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি, সেখানে আরও যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। দক্ষিণ সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডেও একই ধরনের প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে প্রার্থী বাছাইয়ে শুধু সাংগঠনিক পরিচয় নয়, স্থানীয় বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কাউন্সিলর পদে প্রস্তুতির পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদেও সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে রেখেছে জামায়াত। ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর শাখার আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের নাম দলীয় পর্যায়ে আলোচিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক অনুষ্ঠানে তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তবে দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, মেয়র প্রার্থীদের নাম কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। অন্যদিকে কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহানগর শাখাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের নির্বাচনী প্রস্তুতির পেছনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা আগে থেকেই জানিয়েছিল দলটি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এনেছে জামায়াত। তবে সংসদ নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলেও দলটি তাদের প্রস্তুতি থামিয়ে রাখেনি।

নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ধাপভিত্তিক সময়সূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে, ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপে, ১৩ মে চতুর্থ ধাপে এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা তফসিল জানানো হয়নি। ফলে সিটি নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি থেমে নেই।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় হওয়ার চিত্রও এখন বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা যাচ্ছে। উত্তর সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন নোমান আহমদী। তাঁর ওয়ার্ডের আওতায় কারওয়ান বাজার, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ, স্টেশন রোড এবং তেজকুনিপাড়ার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। তিনি মহানগর জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদের সদস্য এবং তেজগাঁও থানা জামায়াতের আমির।

নোমান আহমদীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম জানানো হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচারণার কার্যক্রমও চালিয়েছেন। নামাজের পর স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও তাঁদের সমস্যার কথা শোনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন আবদুস সাত্তার সুমন। বেইলি রোড, ইস্কাটন, মন্ত্রিপাড়া, বাংলামোটর, সিদ্ধেশ্বরী, পশ্চিম মালিবাগ, কাকরাইল, মিন্টো রোড ও সেগুনবাগিচার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ জামায়াতের শুরা সদস্য ও সহপ্রচার সম্পাদক।

আবদুস সাত্তার সুমনের কর্মকাণ্ডেও নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রমের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ভোটারদের সঙ্গে কুশলবিনিময়, মেডিক্যাল ক্যাম্প ও মশকনিধন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন বলেও জানিয়েছেন।

জামায়াতের নেতারা বলছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওয়ার্ডে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য শুধু প্রচারণা চালানো নয়; বরং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করাও এর একটি অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় কাজ করার সুযোগ পেলে ভোটারদের সঙ্গে প্রার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে এবং নির্বাচনের সময় দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে।

তবে দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা মানেই চূড়ান্ত মনোনয়ন নয়। ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বশীল নেতারাও জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হতে পারে এবং বিকল্প প্রার্থী বেছে নেওয়া হতে পারে। ফলে বর্তমানে মাঠে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দলীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষাও করতে হচ্ছে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতিও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলে ঢাকার দুই সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে মেয়র ও কাউন্সিলর—দুই স্তরের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাই, জোটগত সমঝোতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি তাই ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণে দলটির অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা দিচ্ছে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা নির্বাচনী রাজনীতিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। ভোটের দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত না হলেও ওয়ার্ডভিত্তিক যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজেদের পরিচিতি তৈরি করছেন। ফলে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক ধরনের প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের প্রস্তুতি এখন বেশ এগিয়ে রয়েছে। ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১২টিতে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম বাছাই এবং মাঠে তাঁদের কার্যক্রম শুরু হওয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, দলটি তফসিল ঘোষণার আগেই নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। তবে চূড়ান্ত মনোনয়ন, নির্বাচনের সময়সূচি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্ধারণের পরই ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনী প্রতিযোগিতার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। আপাতত সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা এবং দলীয় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে জামায়াতের স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com