ডিজিটাল লেনদেনে কৃষকদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৮ বার
ডিজিটাল লেনদেনে কৃষকদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যভিত্তিক নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ উদ্যোগের আওতায় কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতারা ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। কৃষকদের নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইএফপিআরআইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে নেওয়া দুই বছর মেয়াদি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে সহায়তা দিচ্ছে গেটস ফাউন্ডেশন।

চলতি অক্টোবর মাসে উদ্যোগটি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিটি চলবে ২০২৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ৫০ হাজার কৃষক এবং দেড় হাজার কৃষি উপকরণ বিক্রেতাকে উদ্যোগটির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা, ফসলের পরিচর্যা, বীজ ও সার কেনা, সেচের ব্যবস্থা করা এবং ফসল কাটার আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে কৃষকদের নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক কৃষকের আয় মৌসুমভিত্তিক হওয়ায় তাঁদের পক্ষে সব সময় প্রচলিত ব্যাংকঋণের শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নিয়মিত আয়ের প্রমাণ এবং আর্থিক লেনদেনের গ্রহণযোগ্য নথি না থাকায় অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েন। ফলে তাঁদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যকে ঋণযোগ্যতা মূল্যায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে চায় ব্র্যাক ব্যাংক। কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতারা তাঁদের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যক্রমে ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করলে সেই তথ্য থেকে তাঁদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের একটি চিত্র তৈরি করা সম্ভব হবে। এর ভিত্তিতে ব্যাংক গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের নতুন সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে অনেক কৃষক স্থানীয় কৃষি উপকরণ বিক্রেতার কাছ থেকে বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করেন। এসব কেনাবেচার সঙ্গে কৃষকের আয়, ব্যয় এবং ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে। এসব লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হলে আর্থিক কার্যক্রমের একটি নথিভুক্ত ইতিহাস তৈরি হতে পারে। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো সেই তথ্য ব্যবহার করে কৃষক ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় প্রবেশের পথ আরও সহজ করা।

তবে ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস থাকলেই কোনো কৃষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ পাবেন, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্ধারিত যোগ্যতা, শর্ত এবং মূল্যায়নপ্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে। কর্মসূচির আওতায় আবেদন, ঋণ অনুমোদন, পরিশোধের সময়সীমা এবং অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কার্যক্রম চালুর পর জানা যাবে। তাই সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য কর্মসূচির নিয়মাবলি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আস্থা’, ‘সাফল্য’ ও ‘জীবিকা’ নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ঋণসেবা তৈরি এবং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের প্রচলিত শাখায় সরাসরি উপস্থিত হওয়ার সুযোগ সীমিত—এমন কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছেও আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতারা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা যেমন কৃষিকাজকে প্রভাবিত করে, তেমনি কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ব্যবসার মূলধনও স্থানীয় কৃষি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই শ্রেণির মানুষের আর্থিক লেনদেনকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনার মাধ্যমে তাঁদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কৃষকদের অংশগ্রহণ, ডিজিটাল সেবার ব্যবহারযোগ্যতা এবং ঋণপ্রাপ্তির বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।

কর্মসূচিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা। আইএফপিআরআই উদ্যোগটির প্রভাব মূল্যায়নে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করবে। এর মধ্যে দৈবচয়নভিত্তিক মূল্যায়নও থাকবে। গবেষণার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে, কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণে কোন বিষয়গুলো সহায়ক ভূমিকা রাখে এবং কী ধরনের বাধা তাঁদের অংশগ্রহণকে সীমিত করে।

এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনে এবং বৃহত্তর পরিসরে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা হবে। গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ ও কর্মসূচি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে। পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে কৃষকদের জন্য আরও কার্যকর আর্থিক সেবা তৈরির পথও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেছেন, কৃষক ও ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক ব্যবসা দেশের অর্থনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। দৈনন্দিন ডিজিটাল লেনদেনকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানো গেলে কৃষক ও কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

গেটস ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি প্রোগ্রাম অফিসার স্নিগ্ধা আলী বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে কৃষকদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে। কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কৃষিকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের বিকল্প বাড়তে পারে। তবে বাস্তবে এর সুফল কতটা পৌঁছাবে, তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো ও প্রকল্পপ্রধান মেহরাব বখতিয়ার বলেছেন, বাংলাদেশের অনেক কৃষক এখনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। ডিজিটাল আর্থিক সেবা তাঁদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনে এবং তাঁদের পুরোপুরি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে কী প্রয়োজন, তা গবেষণার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে।

এ অংশীদারত্ব চুক্তিতে ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং আইএফপিআরআইয়ের মহাপরিচালক জোহান সোয়িনেন। ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে এ অংশীদারত্বকে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

তবে ডিজিটাল ঋণ কার্যক্রমের সাফল্যের জন্য শুধু প্রযুক্তি ও লেনদেনের তথ্য যথেষ্ট নয়। কৃষকদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, আর্থিক তথ্যের নিরাপত্তা এবং ঋণের শর্ত সম্পর্কে সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কৃষক যেন ঋণের খরচ, সুদ বা মুনাফার হার, কিস্তি পরিশোধের নিয়ম এবং সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে সম্ভাব্য দায় সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানতে পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে সম্পর্কেও স্বচ্ছতা জরুরি।

৫০ হাজার কৃষক ও দেড় হাজার কৃষি উপকরণ বিক্রেতাকে যুক্ত করার লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে উদ্যোগটি গ্রামীণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর একটি পরীক্ষামূলক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য দেখতে হবে, কতজন কৃষক বাস্তবে ঋণ পাচ্ছেন, অর্থায়ন তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঋণ ব্যবহারের ফলে তাঁদের আর্থিক কার্যক্রমে কী পরিবর্তন আসছে।

সব মিলিয়ে, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কাজে লাগিয়ে কৃষক ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোই ব্র্যাক ব্যাংক, আইএফপিআরআই ও গেটস ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। ২০২৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা থাকা পরীক্ষামূলক কর্মসূচির গবেষণা ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে এমন সেবা চালুর সম্ভাবনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময়ে অর্থায়ন পৌঁছানো এবং আর্থিক ব্যবস্থায় তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগটি কতটা সফল হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com