প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে আনন্দ ভ্রমণে এসে আবারও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নীল জলরাশির উত্তাল ঢেউ আর দিগন্তজোড়া সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে অকালে ঝরে গেল চারটি তাজা প্রাণ। সমুদ্রসৈকতের হিমছড়ি পয়েন্টে সাগরে গোসলে নেমে তীব্র পানির স্রোত ও প্রাণঘাতী গুপ্তখালের টানে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন চার তরুণ পর্যটক। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বুধবার বিকেলে তিনজনের নিথর দেহ সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে বিস্তৃত উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার সকালে আরও এক পর্যটকের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় নিবিড় নামের অপর এক পর্যটক এখনও অতল সাগরে নিখোঁজ রয়েছেন। নিমিষেই প্রিয়জনদের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের মাতম ছড়িয়ে পড়েছে।
আকস্মিক ও করুণ এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক এবং হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) সুমনাথ বসু। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করা চার পর্যটক হলেন রাজধানী ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. বোরহান (২৩), সাইফুল ইসলাম (২৩) ও নাফিসুল হক (২২) এবং চট্টগ্রাম জেলা থেকে আগত তরুণ হারুনুর রশিদ (২৫)। অন্যদিকে সাগরের লোনা পানিতে এখনও নিখোঁজ থাকা নিবিড় নামের পর্যটকের বাড়িও চট্টগ্রামে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে বন্ধুদের দুটি পৃথক দল সমুদ্র দর্শনের আনন্দ উপভোগ করতে কক্সবাজারে ঘুরতে আসে। ভ্রমণের অংশ হিসেবে তারা বুধবার বিকেলে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন হিমছড়ি সৈকত পয়েন্টে বেড়াতে যায়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পর্যটকরা দলবেঁধে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে সাগরের লোনা পানিতে গোসল করতে নামেন। এ সময় উত্তাল সাগরের শক্তিশালী ঢেউ এবং তলে থাকা ভয়াবহ গুপ্তখালের টানে মুহূর্তের মধ্যেই পাঁচজন পর্যটক গভীর সাগরে ভেসে যান। পাড়ে থাকা অন্যান্য সহপাঠী ও পর্যটকদের চিৎকারে স্থানীয় বিচ কর্মী, কোস্টগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্যরা দ্রুত উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তাৎক্ষণিক তল্লাশি চালিয়ে বুধবার বিকেলেই তিনজনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে বৈরী আবহাওয়া ও অন্ধকারের কারণে তখন দুজন নিখোঁজ থাকেন। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে আবারও নতুন করে উদ্ধার অভিযান শুরু হলে সাগরে ভেসে ওঠা আরও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ পর্যটক নিবিড়কে উদ্ধারে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের উদ্ধারকারী ডুবুরি দল যৌথভাবে সাগরে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দীর্ঘতম এই বালুকাময় সৈকতে আনন্দ ভ্রমণে এসে প্রতি বছরই সাগরের বুকে এমন অসংখ্য পর্যটকের সলিল সমাধি ঘটছে। সমুদ্র বিজ্ঞানী ও স্থানীয়দের মতে, বছরের বিভিন্ন সময়ে সৈকতের গতিপথ পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে জোয়ার-ভাটার সময় পানির নিচে গভীর গুপ্তখাল বা ‘রিপ কারেন্ট’ তৈরি হয়। সৈকতে ঘুরতে আসা সাধারণ পর্যটকরা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং লাল পতাকার নির্দেশিকা বা সতর্কতা সংকেত না মেনে অগোচরেই সেই ডেঞ্জার জোনে বা গুপ্তখালে নেমে পড়েন। ফলে শক্তিশালী পানির টানে মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যান তারা। হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আনন্দ ভ্রমণে এসে সাগরের উত্তাল ঢেউ আর গুপ্তখালের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ১৬ জন পর্যটকের করুণ প্রানহানি ঘটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মৃত্যুর মিছিল আশঙ্কাজনকভাবে উর্ধমুখী আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এই বার্ষিক প্রাণহানির হার দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৬ জনে, যা পর্যটন শিল্পের জন্যও একটি মারাত্মক অশনিসংকেত।
আকস্মিক ও ভয়াবহ এই সমুদ্র দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক এবং হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ইনচার্জ (আইসি) সুমনাথ বসু। পুলিশ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় উদ্ধারকারী সূত্রে জানা গেছে, সাগরের লোনা পানিতে সলিল সমাধি হওয়া চার তরুণ পর্যটক হলেন রাজধানী ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার তরুণ মো. বোরহান (২৩), একই এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (২৩) ও নাফিসুল হক (২২) এবং চট্টগ্রাম জেলা থেকে পর্যটন নগরীতে ঘুরতে আসা তরুণ হারুনুর রশিদ (২৫)। অন্যদিকে সাগরের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে এখনও নিখোঁজ থাকা পর্যটক নিবিড় (২৪) চট্টগ্রাম শহরের অধিবাসী বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
দুর্ঘটনার বিশদ বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন প্রাণোচ্ছল তরুণের সমন্বয়ে গঠিত দুটি পৃথক দল সমুদ্র দর্শনের আনন্দ উপভোগ করতে কক্সবাজারে বেড়াতে আসে। ভ্রমণের সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বুধবার বিকেলে তারা শহর থেকে কিছুটা দূরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন নিভৃত ও প্রাকৃতিক হিমছড়ি সৈকত পয়েন্টে ঘুরতে যান। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দে মেতে উঠে পর্যটকরা সবাই মিলে সারিবদ্ধভাবে সাগরের পানিতে নেমে গোসল করা ও ছবি তোলায় মগ্ন হন। এ সময় হঠাৎ করেই গভীর সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা বিশাল আকারের শক্তিশালী একটি ঢেউ এবং বালুর নিচে থাকা ভয়াবহ গুপ্তখালের শক্তিশালী টান তাদের ওপর আঘাত হানে। চোখের পলকে ৫ জন পর্যটক মূল তীর থেকে ছিটকে পড়ে গভীর সাগরে তোড়ের মুখে ভেসে যেতে থাকেন।
পাড়ে অবস্থানরত তাদের অন্যান্য সহপাঠী ও স্বজনদের আর্তচিৎকারে স্থানীয় সৈকতকর্মী বা বিচ কর্মী, ডলফিন লাইফ গার্ড, কোস্টগার্ড এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের উদ্ধারকারী টিম তড়িঘড়ি করে স্পিডবোট নিয়ে সাগরে তল্লাশি অভিযানে নামে। সাগরের উত্তাল তরঙ্গের সাথে যুদ্ধ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বুধবার বিকেলেই পানি থেকে ৩ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে সাগরে বৈরী আবহাওয়া, প্রবল বাতাস এবং অন্ধকারের কারণে রাতে উদ্ধার তৎপরতা সাময়িকভাবে সীমিত রাখতে হয়, যার ফলে তখন দুজন পর্যটক নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর ফায়ার সার্ভিস ডুবুরি দল পুনরায় তল্লাশি জোরদার করে। তল্লাশির একপর্যায়ে সকালে সৈকতের অদূরে সাগরে ভেসে ওঠা আরও এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এখনও সাগরে নিখোঁজ থাকা নিবিড়কে খুঁজে বের করতে লাইফ গার্ড, স্থানীয় জেলে এবং কোস্টগার্ডের বিশেষ ডুবুরি দল যৌথভাবে পুরো হিমছড়ি ও ইনানী পয়েন্টে মেগা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের দীর্ঘতম এই বিশ্বখ্যাত বালুকাময় সৈকতে আনন্দ ভ্রমণে এসে প্রতি বছরই সাগরের বুকেই এভাবে বহু পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে চলেছে। সমুদ্র বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রবীণ মাঝিমাল্লাদের মতে, বছরের বিভিন্ন ঋতুতে সমুদ্রের গতিপথ পরিবর্তন, পানির তলদেশের পলির বিন্যাস এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের দরুন জোয়ার-ভাটার সময় সাগরের তলদেশে অদৃশ্য বিশাল সব বিপদজনক খাদ বা ‘গুপ্তখাল’ সৃষ্টি হয়, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘রিপ কারেন্ট’ বলা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সাগরের প্রকৃতি, ভাটার সঠিক সময় এবং পানির গতিবিধি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকায় তারা অনভিজ্ঞতার কারণে সতর্কতা না মেনে অনায়াসে বিপজ্জনক জোনে নেমে পড়েন। লাইফ গার্ডের টানানো লাল পতাকা ও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অতলে নামার কারণেই পানির তীব্র চোষক টানে নিমেষেই তলিয়ে যান সাধারণ মানুষ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্ষণিকের আনন্দের জন্য সাগরে নেমে এভাবে গুপ্তখালের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর অন্তত ৬ থেকে ১৬ জন নিরীহ পর্যটক অকালে প্রাণ হারান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসচেতনতার কারণে এই প্রাণহানির গ্রাফ আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রূপ ধারণ করে বছরে গড়ে ১২ থেকে ১৬ জনে পৌঁছেছে, যা দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতের জন্য মারাত্মক হুমকি ও উদ্বেগের বিষয়।
সৈকতে বারবার তরুণ প্রাণ এভাবে ঝরে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং সচেতন নাগরিকদের মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, সৈকতে লাইফ গার্ড ও নির্দেশিকা বোর্ড থাকা সত্ত্বেও সীমানা অতিক্রম করে গোসলে নামা এবং জোয়ার-ভাটার সময়সূচি অমান্য করাই এ ধরনের ট্র্যাজেডির প্রধান কারণ। ঘটনায় নিহত পর্যটকদের পরিবারের সদস্যদের ইতিমধ্যেই খবর পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারকৃত চার মরদেহের প্রয়োজনীয় সুরতহাল ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত স্বজনদের হাতে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিচ্ছে স্থানীয় থানা পুলিশ। একই সাথে উদ্ধারকারী দলগুলো শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ পর্যটক নিবিড়কে সাগরের বুক থেকে উদ্ধার করতে তাদের সর্বাত্মক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
সৈকতে বারবার তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। উদ্ধার কাজ তদারকিকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সাগরে নেমে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে যাওয়া, ভাটার সময় পানিতে নামা এবং বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত পয়েন্টগুলোতে লাল পতাকা থাকা সত্ত্বেও গোসল করতে নামার কারণে এই ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। নিহতের স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিখোঁজ নিবিড়কে দ্রুত জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলো।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত