প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ী এলাকার একটি হিমাগারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষক বোরহান উদ্দিন। নিজের জমিতে ফলানো আলু ভালো দামে বিক্রি করে গত বছরের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশায় তিনি বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু মৌসুম শেষে বাজারের চিত্র তাঁর সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে যে খরচ হয়েছে, তার তুলনায় বাজারে আলুর দাম এতটাই কম যে এখন আলু বিক্রি করলেও লোকসান আরও বাড়বে।
আলুর বর্তমান বাজারদর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বোরহান। তাঁর ভাষায়, ‘হামরা মরি গেইনো মারা গেলাম বাহে। আলুর দাম নাই। আর আলু আবাদ করবার নাই।’ তাঁর কথায় শুধু একজন কৃষকের হতাশা নয়, রংপুর অঞ্চলের হাজারো আলুচাষির বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার চেংমারী গ্রামের এই কৃষক গত মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে টিভিএস, স্টিক ও শিল জাতের আলু চাষ করেছিলেন। বিশেষ করে টিভিএস ও স্টিক আলুর উৎপাদন ব্যয় পড়েছে কেজিপ্রতি ২৭ টাকারও বেশি। অথচ হিমাগারের গেটে বর্তমানে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ শুধু উৎপাদন খরচের হিসাবেই কেজিপ্রতি প্রায় ১৫ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে।
গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু চাষ করেছিলেন বোরহান উদ্দিন। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় তাঁর সেই আশাও ভেঙে গেছে। কৃষকের ভাষায়, এক বছরের লোকসান সামলে পরের বছর ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু টানা দুই মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এখন আলু চাষ চালিয়ে যাওয়া নিয়েই তিনি অনিশ্চিত।
মিঠাপুকুরের কানুদাসপাড়া গ্রামের দুই ভাই খোরশেদ আলী ও আমিনুর রহমানের অবস্থাও একই। এবার তাঁরা চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। উৎপাদিত আলুর বড় অংশ লাভের আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মৌসুমের শুরুতে কম দাম থাকলেও কয়েক মাস পর বাজারে দাম বাড়বে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং হিমাগার থেকে আলু বের করে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠে আসছে না।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮২৫ টাকা। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া, খালি বস্তা, হিমাগারে পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি এবং বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও চাষাবাদের অন্যান্য খরচ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হিমাগারের গেটে প্রতি কেজি আলু প্রায় ১২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ৫৫ কেজির এক বস্তা আলু ১২ টাকা দরে বিক্রি করলে পাওয়া যায় মাত্র ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি প্রায় ১৬৫ টাকা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
কৃষকদের জন্য এই হিসাব আরও উদ্বেগের, কারণ ৮২৫ টাকার হিসাবের মধ্যেই তাঁদের সব ধরনের আর্থিক ঝুঁকি সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। বাজারে আলুর দাম কমে যাওয়ার পাশাপাশি হিমাগারে সংরক্ষণকালে ওজন কমে যাওয়া, আলু নষ্ট হওয়া এবং পরিবহনসহ বিভিন্ন অতিরিক্ত ব্যয়ও কৃষকের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে বাস্তব লোকসান অনেক ক্ষেত্রেই হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমানের অভিজ্ঞতাও একই রকম হতাশার। তিনি এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এত বড় পরিমাণ জমিতে চাষ করেও এখন তাঁর মূল চিন্তা লাভ নয়, উৎপাদন খরচ আদৌ উঠবে কি না। এর আগের বছর তিনি ৬৯ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন এবং সেখানে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই বিনিয়োগের পুরো অর্থও তুলতে পারেননি তিনি। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তাঁর সামনে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রংপুরের বিভিন্ন হিমাগার ও কৃষক পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রকারভেদে হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ১১ থেকে ১৪ টাকা দরে। এই দামে আলু বিক্রি করলে কৃষকদের কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অনেক কৃষক আপাতত আলু বিক্রি না করে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের আশা, সামনে বাজারে চাহিদা বাড়লে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
রংপুর মহানগরের কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় দুটি হিমাগারে প্রায় ৫০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। বর্তমান বাজারদর তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তিনি আপাতত আলু বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতো আরও অনেক কৃষক ও আলু ব্যবসায়ী একই অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আলু ধরে রাখারও রয়েছে নিজস্ব খরচ ও ঝুঁকি। ফলে দাম না বাড়লে কৃষকদের সামনে শেষ পর্যন্ত লোকসানে আলু বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প নাও থাকতে পারে।
রংপুর বিভাগের আলু উৎপাদনের চিত্রও এ সংকটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বিভাগের আট জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদিত হয়েছে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন। কিন্তু বিপুল উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণ সক্ষমতা অনেক কম। বিভাগের ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন আলু, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ২৩ দশমিক ১ শতাংশ।
সংরক্ষিত আলুর বড় একটি অংশ এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। হিসাব অনুযায়ী, সংরক্ষিত আলুর প্রায় ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন আলু এখনো মজুত রয়েছে। বিপুল পরিমাণ আলু একই সময়ে বাজারে আসার সম্ভাবনা থাকায় কৃষকেরা দাম নিয়ে আরও চাপের মধ্যে পড়ছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দর কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সারা দেশের চিত্রও খুব একটা আলাদা নয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হিমাগার এবং অ-হিমায়িত মডেল ঘর মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে খাবার ও বীজ আলু উভয়ই রয়েছে। উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণ সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হলে কৃষকদের ওপর তার প্রভাব পড়ে।
রংপুরে বর্তমানে ৪২টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে খাবার ও বীজ মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন হিমাগারে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু মজুত রয়েছে। কোনো কোনো হিমাগারে ধারণক্ষমতার অর্ধেকের কাছাকাছি আলু পড়ে থাকলেও বাজারে চাহিদা ও দাম আশানুরূপ না হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত বিক্রির ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
হিমাগার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ধরনের আলু কেজিপ্রতি ১১ থেকে ১৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে হিমাগারে আলু রাখার খরচও কম নয়। ফলে দীর্ঘদিন মজুত করে রাখলেও কৃষকের ব্যয় বাড়তে থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছর ধরেই আলুতে কৃষকের লোকসানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে ফসল নির্বাচন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই জমিতে প্রতিবছর শুধু আলু চাষ না করে কিছু জমিতে ভুট্টা, বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ধান চাষের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকের জন্য আলুর বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তাই শুধু একটি মৌসুমি সংকট নয়; এটি উৎপাদন পরিকল্পনা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন কৃষক যখন নিজের জমি, শ্রম, বীজ, সার, সেচ ও অর্থ বিনিয়োগ করে ফসল উৎপাদন করেন, তখন উৎপাদন খরচের নিচে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হলে তাঁর পরবর্তী মৌসুমের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যায়। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতার ওপর।
রংপুরের আলুচাষিদের বর্তমান দুরবস্থা তাই কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। উৎপাদনের সময় কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় বাজারে ধস নামলে যেন বিকল্প ব্যবস্থাপনা থাকে—এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান কঠিন। একই সঙ্গে চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৃষকদের ফসল নির্বাচন এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় আরও কার্যকর পরামর্শ দেওয়াও জরুরি।
হিমাগারের সামনে দাঁড়িয়ে বোরহান উদ্দিনের হতাশা কিংবা ৫০০ বস্তা আলু বিক্রি না করে অপেক্ষায় থাকা ভুপাল চন্দ্র রায়ের সিদ্ধান্ত আসলে একই সংকটের কথা বলে। কৃষকের ঘাম, বিনিয়োগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে যখন বাজারদরের কোনো মিল থাকে না, তখন একটি ভালো ফলনও তাঁদের জন্য আশীর্বাদের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। রংপুরের আলুচাষিদের সামনে এখন তাই একটাই প্রশ্ন—উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি না করে কীভাবে তাঁদের ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা যাবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত