‘ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামের সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হুথিদের কমান্ড সেন্টার, সামরিক অবস্থান, সেনাসমাবেশ এবং রসদ সরবরাহের পথকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
তবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে সামরিক অভিযানের প্রকৃত প্রভাব, নিহত ও আহত ব্যক্তির সংখ্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পরিমাণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো সীমিত।
ইয়েমেনের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলির নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা সহজ করতে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল হুথিদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সামরিক অবস্থান, সেনাসমাবেশ এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত। পাশাপাশি তাদের রসদ সরবরাহের পথ ও সামরিক যানবাহনও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে হুথিদের ৪৪০ জন কমান্ডার ও যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যার মধ্যে কতজন নিহত এবং কতজন আহত হয়েছেন, তার পৃথক হিসাব স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। একইভাবে ক্ষয়ক্ষতির দাবির পক্ষে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ বা নিরপেক্ষ সূত্রের বিস্তারিত তথ্যও পাওয়া যায়নি।
এ ধরনের সংঘাতে সামরিক বাহিনীগুলোর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হতে পারে। তাই অভিযানের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা ছাড়াও দখলকৃত এলাকার পরিবর্তন, সরবরাহব্যবস্থার অবস্থা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী আরও দাবি করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় ১৪৬টি সামরিক যান, ভারী অস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস অথবা অকার্যকর করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে তাদের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল করা।
সামরিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে, কোনো বাহিনীর রসদ সরবরাহের পথ ও কমান্ডকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের যোগাযোগ, সেনা মোতায়েন এবং অস্ত্র সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। তবে ইয়েমেনের চলমান অভিযানে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তা নির্ধারণের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
আল-জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও সরকারি বাহিনীর অভিযান এবং হুথিদের বিরুদ্ধে একাধিক ফ্রন্টে অগ্রগতির দাবির কথা উঠে এসেছে। তবে সামরিক সূত্রের এসব দাবি এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের তাইজ অঞ্চলেও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। সরকারি বাহিনীর দাবি, আগে হারানো কিছু অবস্থান পুনর্দখলের জন্য হুথিদের চালানো প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে বাহিনীটি।
তাইজ দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। অঞ্চলটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন সড়ক ও যোগাযোগপথের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই সামরিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হুথিদের সেনাসমাবেশ ও শক্তিবৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে বিদ্রোহীদের এক ফ্রন্ট থেকে অন্য ফ্রন্টে সেনা ও সরঞ্জাম স্থানান্তরের সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে তাইজে কোন কোন এলাকা বর্তমানে কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে কতটা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে এবং উভয় পক্ষের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি কত—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি ফ্রন্টেও লড়াই তীব্র হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব, ধুবাব ও আল-মুদারাবাহ এলাকায় দায়িত্বে থাকা সরকারি বাহিনীগুলো জানিয়েছে, হুথিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্রোহীদের শক্তিবৃদ্ধির জন্য পাঠানো সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবিও করেছে তারা।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতায়াত করে।
এ কারণে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও আশপাশের এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নৌপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তবে বর্তমান অভিযানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে নতুন কোনো বিঘ্ন ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের শিকড় বহু বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রোথিত। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।
এরপর থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী, হুথি বিদ্রোহী এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ চলেছে। সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বহু পরিবার মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় নতুন করে সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ার অর্থ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাও জড়িত।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত সব পক্ষেরই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের দাবি করলেও অভিযানের প্রকৃত ফলাফল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর প্রকাশিত দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারি বিবৃতি, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য এবং মানবিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিহত ও আহত ব্যক্তির সংখ্যা, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এবং আবাসিক এলাকায় হামলার প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের আওতায় সরকারি বাহিনীর হামলা এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে অগ্রগতির দাবি দেশটির সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে ১ হাজার ৩০০টির বেশি হামলা, ৪৪০ জনের হতাহত হওয়া এবং সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের হিসাব এখনো সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্যনির্ভর। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশিত হলে অভিযানের প্রকৃত প্রভাব এবং ইয়েমেনের সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন আরও পরিষ্কার হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত