মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আ.লীগের ২৮ জন আটক

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আ.লীগের ২৮ জন আটক

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২৮ জনকে আটক বা গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে গোয়েন্দা পুলিশ এবং আরও ১৭ জনকে মিরপুর থানা পুলিশ আটক করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের বক্তব্যে আটকের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে, ফলে পূর্ণাঙ্গ যাচাই শেষে মোট সংখ্যা ও সবার পরিচয় আরও স্পষ্ট হতে পারে।

পুলিশের দাবি, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী আন্দোলনস্থলে ঢুকে সহিংসতা ও নাশকতার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং পরে মিছিল করার প্রস্তুতিতে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

রোববার মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সকাল থেকে বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন পোশাকশ্রমিকেরা। একপর্যায়ে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে এবং আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।

ডিবি মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন। পুলিশের দাবি, তাঁদের কয়েকজন মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে ইন্ধন দিচ্ছিলেন। তাঁদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য, আন্দোলনস্থলের ছবি ও ভিডিও এবং আর্থিক লেনদেনের কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের একটি অংশ বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মিরপুরে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সক্রিয় নেতাকর্মী রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ আরও বলেছে, আন্দোলনের ঘটনাস্থলে রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, পল্লবী ও রূপনগর এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা এবং রূপনগর এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী শুভ নাশকতার সমন্বয়ে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করে মিরপুরে আনার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

পুলিশের দাবি, আন্দোলনের সময় প্রায় শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। এরই মধ্যে আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন, যোগাযোগের তথ্য এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও-ছবি বিশ্লেষণ করে অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রাকিব ও আরিফ নামে দুজনকে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের মোবাইল ফোনে অগ্নিসংযোগের ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে আইনগতভাবে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তদন্ত শেষে প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।

এদিকে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির বিষয়টিও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করে আসছেন। তাঁদের দাবি ঘিরে ইতোমধ্যে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে শ্রমিকদের একটি অংশ দাবি করছে, বর্তমান আয় দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তাঁরা রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন।

রোববারের সংঘর্ষে শ্রমিক আন্দোলনের মূল দাবির সঙ্গে সহিংসতার ঘটনা মিশে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার প্রশ্ন, অন্যদিকে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অগ্নিসংযোগ—দুটি ভিন্ন বাস্তবতা একই ঘটনার মধ্যে সামনে আসে। ফলে সাধারণ শ্রমিকদের দাবিকে সহিংসতার অভিযোগ থেকে আলাদা করে দেখা এবং প্রকৃত নাশকতাকারীদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সময় মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ, কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেককে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তাজনিত কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশনে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে সড়ক ও গণপরিবহন—দুই ক্ষেত্রেই মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।

ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেছেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সড়ক থেকে তাঁরা সরে না যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ অভিযান চালায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের মধ্যে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র ঢুকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে পুলিশের ধারণা। পুলিশ সড়ক পরিষ্কার করতে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে বলেও তিনি জানান।

তবে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীর আন্দোলনসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। পুলিশের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনের ভেতরে রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা ছবি কোনো ব্যক্তির অপরাধে জড়িত থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে ২৮ জন আটকের কথা বলা হলেও পরবর্তী পর্যায়ের পুলিশের বক্তব্যে ১৯ জনের তথ্যও এসেছে। আবার অন্য প্রতিবেদনে ২৯ জন আটকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযানের সময় ও বিভিন্ন ইউনিটের পৃথক তথ্য একত্র করার পর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মিরপুরের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও শ্রমিকদের মূল দাবি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও তাদের নিরাপদে আন্দোলনের অধিকার যেমন বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, তেমনি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর বা পুলিশের ওপর হামলার মতো অপরাধের সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা সহিংসতার কারণে আড়ালে না পড়ে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য আন্দোলনে যুক্ত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। মিরপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি, নগরজীবনের স্বাভাবিকতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা একই জায়গায় এসে মিললে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এ অবস্থায় মজুরি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, সাধারণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা—তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তদন্তে প্রকৃত নাশকতার পরিকল্পনা ও এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা পরিষ্কার হলে পুরো ঘটনার একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র সামনে আসবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত দাবির গ্রহণযোগ্য সমাধান হলে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা কমিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথও সহজ হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com