প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন দেশটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভা। বুথফেরত জরিপের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, রোববার অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই গিউরভ পেয়েছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট। এরই মধ্যে গিউরভ পরাজয় মেনে নিয়ে বলেছেন, জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেটিকে সম্মান করতে হবে।
চূড়ান্ত সরকারি ফলাফল বুথফেরত জরিপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বুলগেরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে। ইলিয়ানা ইয়োতোভাই দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এর আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৬১ বছর বয়সী ইয়োতোভা চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র রুমেন রাদেভ পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ইয়োতোভা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে রাদেভ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইয়োতোভার নির্বাচনী বিজয় দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় দফার ভোটে ইয়োতোভার জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। প্রথম দফার ভোটেও তিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। সে সময় ইয়োতোভা প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট পান, আর গিউরভ পেয়েছিলেন প্রায় ৩২ শতাংশ। তবে প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় দফায়। জনমত জরিপে ইয়োতোভার তুলনামূলক বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও প্রথম দফার প্রকৃত ভোটের ফলে দুই প্রার্থীর ব্যবধান ছিল খুবই কম।
দ্বিতীয় দফায় ভোটার উপস্থিতিও ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, এবার ভোট পড়েছে আনুমানিক ২৭ থেকে ২৯ শতাংশ। প্রথম দফায় ভোট পড়েছিল মাত্র ২৩ শতাংশ, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে রেকর্ড সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় দফায় উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও তুলনামূলকভাবে কম। এতে দেশটির সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আগ্রহ, আস্থা ও অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সোফিয়ায় ভোট দিতে আসা ভোটারদের বক্তব্যেও রাজনৈতিক অনীহা ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। রাজধানীর ৬৪ বছর বয়সী শিক্ষক ক্রাসিমিরা কোস্তোভা ভোট দেওয়ার পর জানান, দুই প্রার্থীর কাউকেই তাঁর পছন্দ হয়নি। আবার ৬৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী পেতার দোইচিনভ প্রথম দফার ভোটে অংশ নেননি। তাঁর ধারণা ছিল, নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়াবে। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় ভোট দিতে এসে তিনি নিজের ভাষায় ‘কম খারাপ’ প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর মতে, দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থানের কোনোটিই তাঁর গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভোটারদের এমন মনোভাব বুলগেরিয়ার নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। নির্বাচনে কোনো একটি দলের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থনের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মধ্যে তুলনামূলক পছন্দের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কম ভোটার উপস্থিতিও সেই রাজনৈতিক দূরত্বের একটি প্রতিফলন হতে পারে।
ইয়োতোভার রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপের পক্ষে এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গিউরভ তুলনামূলকভাবে পশ্চিমাপন্থী অবস্থান নিয়েছেন এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন।
নির্বাচনী প্রচারের সময় দুই প্রার্থীর মধ্যে এই নীতিগত পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গিউরভ ইয়োতোভার সমালোচনা করে বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে রাশিয়াকে তার আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ইয়োতোভা শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হতে পারে।
ভোট দেওয়ার পর ইয়োতোভা ইউরোপের সঙ্গে বুলগেরিয়ার সম্পর্কের বিষয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি এমন একটি শক্তিশালী ইউরোপের কথা বলেন, যেখানে বুলগেরিয়াও শক্তিশালী থাকবে। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে একদিকে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নির্বাচনের সময়ে বুলগেরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ছিল আলোচনায়। গত মাসে কৃষ্ণসাগরে দেশটির উপকূলের কাছে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলার পর ২১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব থেকেই এসব হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী রাদেভ এসব হামলার ঘটনায় মস্কোর স্বার্থ রক্ষার সম্ভাবনার কথা বলেছেন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন। তবে তাঁর সরকার একই সঙ্গে জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রয়েছে।
ইয়োতোভা ও গিউরভ—দুই প্রার্থীই কৃষ্ণসাগরের এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধ ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য স্পষ্ট।
বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে এ পদের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ হিসেবে বুলগেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টের অবস্থান রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর যদি বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাসই নিশ্চিত হয়, তাহলে ইলিয়ানা ইয়োতোভার বিজয় শুধু একটি নির্বাচনী ফলাফল হবে না; এটি বুলগেরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ দেশটির রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
তবে নির্বাচনী বিজয়ের পাশাপাশি ইয়োতোভার সামনে থাকবে কম ভোটার উপস্থিতি, রাজনৈতিক আস্থার সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইউরোপের সঙ্গে বুলগেরিয়ার ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন। জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর বুলগেরিয়ার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকনির্দেশনা আরও স্পষ্ট হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত