সাজেকে ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, বাড়ছে খাদ্যসংকট

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
সাজেকে ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, বাড়ছে খাদ্যসংকট

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে পাঁচ দফা দাবিতে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু হয়েছে। এক দিনের জন্য কর্মসূচি শিথিল রাখার পর সোমবার সকাল থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়। এতে সাজেকের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। বড় ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও পরিবহন খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক এলাকা থেকে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা, আগের সংঘাতের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের হয়রানি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি। এসব দাবির চারটি বিষয়ে আলোচনায় সমঝোতার কথা জানানো হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় এখনো অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়নি।

সোমবার সকাল থেকে সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় যানবাহন চলাচল করছে না। তবে সীমিত পরিসরে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। এখন পর্যন্ত নতুন করে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক সড়কে অবরোধ শুরু হয়। টানা কয়েক দিন অবরোধ চলার পর স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কর্মসূচি শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়েও অন্য একটি সংগঠনের ডাকা অবরোধের কারণে সড়কে পণ্যবাহী যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেনি। ফলে এক দিনের শিথিলতার পর সোমবার আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচিতে ফিরে যান আন্দোলনকারীরা।

দীর্ঘদিনের অবরোধে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সাধারণ মানুষ। সাজেকের সঙ্গে নিয়মিত সড়ক যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন ধরে অবরোধ চলতে থাকায় স্থানীয় বাজারে পণ্যের মজুত কমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ সাধারণ মানুষের জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অবরোধের প্রভাব পড়েছে সাজেকের পর্যটন খাতেও। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করেন। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ বা সীমিত থাকায় রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং ছোট ব্যবসার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। পর্যটক না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন আয় কমে যায়, আর দীর্ঘ সময় ব্যবসা বন্ধ থাকলে কর্মচারী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকাতেও চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক অবরোধের কারণে পর্যটন ও পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ ইতোমধ্যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অবরোধের পেছনে থাকা দাবিগুলো নিয়ে গত ২৬ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। বৈঠকে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানায়। তবে সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিটি নিয়ে চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই একটি বিষয়ে মতপার্থক্য থেকেই অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের প্রধান উদ্বেগ সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তারা অভিযোগ করছেন, এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এক নয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

সাজেকের বর্তমান অচলাবস্থার মধ্যে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্দোলনের দাবিগুলোর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার সংশ্লিষ্ট থাকলেও অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে একই জনগোষ্ঠীকে খাদ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত ও আয়-রোজগারের সংকটও মোকাবিলা করতে হয়। ফলে দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোববার এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ এ ঘটনার কথা জানিয়েছেন। দুর্গম এলাকা হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা থাকলেও এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

এর আগে শনিবারও সাজেকের কয়েকটি দুর্গম এলাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষই এসব ঘটনায় নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য থাকলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। কিন্তু অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমঝোতা প্রয়োজন, সেটি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

সাজেকের সংকটের আরেকটি দিক হলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অর্থনৈতিক প্রভাব। পর্যটন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গাড়ির চালক, শ্রমিক, রেস্তোরাঁ কর্মী, দোকানি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। সড়ক বন্ধ থাকলে শুধু পর্যটক আসা বন্ধ হয় না, স্থানীয় পণ্য বাইরে পাঠানো এবং প্রয়োজনীয় পণ্য ভেতরে আনার ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রভাব ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নের সুযোগ যেমন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তেমনি সাধারণ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সাজেকের মানুষ এখন এমন একটি সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাতে একদিকে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বন্ধ হবে না জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থা। অবরোধ কতদিন চলবে বা পরবর্তী সময়ে নতুন করে কোনো আলোচনা শুরু হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পাহাড়ি এই পর্যটনকেন্দ্রের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর সংলাপের বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com