তিতাসে নতুন দুই কূপ খননে একনেকে উঠছে প্রস্তাব

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
তিতাসে নতুন দুই কূপ খননে একনেকে উঠছে প্রস্তাব
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণ এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেটও পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।

দেশে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, পরিবহন এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ও জ্বালানিসংক্রান্ত বিষয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিভিন্ন সময়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সীমিত গ্যাস সরবরাহের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও জ্বালানি সরবরাহ একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগকে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘তিতাস গ্যাসফিল্ডে ২টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বিজিএফসিএল। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪৫৪ কোটি টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় তিন বছরের মধ্যে দুটি কূপ খনন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং গ্যাস উত্তোলনের জন্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হওয়ার পর দরপত্র, ঠিকাদার নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং খনন কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করার বিষয়টি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, প্রথম বছরের মধ্যেই একটি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে। আর দেড় বছরের মধ্যে দুটি কূপই উৎপাদনে আসার লক্ষ্য রয়েছে। এই সময়সূচি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে দেশের চলমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও অতিরিক্ত জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আবুল কাসেম খান জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত দুটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। কনডেনসেট প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া এক ধরনের তরল হাইড্রোকার্বন, যা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।

উৎপাদিত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। ফলে নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং অন্যান্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে বাস্তবে কতটা গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে কূপের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা, পাইপলাইন অবকাঠামো এবং জাতীয় গ্রিডের পরিবহন সক্ষমতার ওপর।

প্রকল্পের আর্থিক বিশ্লেষণেও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০ বছরে দুটি কূপ থেকে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য বিবেচনায় এই গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে এই মূল্যায়ন সম্ভাব্য উৎপাদন ও নির্ধারিত মূল্য কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত উৎপাদন, গ্যাসের ব্যবহার এবং বাজারমূল্যের পরিবর্তনের কারণে আর্থিক ফলাফলে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।

প্রকল্পের আওতায় কূপ দুটি খননের জন্য বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হবে। খননকাজের পাশাপাশি গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ব্যবহার করে কূপ খনন এবং উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রকল্পের সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র। পেট্রোবাংলার অধীন বিজিএফসিএল পরিচালিত এই গ্যাসক্ষেত্র দেশের জাতীয় জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন দুটি কূপের সম্ভাব্য উৎপাদন যুক্ত হলে বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত গ্যাস যোগ হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণে এটি সহায়ক হতে পারে।

দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা বাড়লেও পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেক কূপে উৎপাদন কমে আসার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় নতুন কূপ খননের পাশাপাশি বিদ্যমান কূপগুলোর সংস্কার, উন্নত অনুসন্ধান প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন গ্যাসের মজুত শনাক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচেও চাপ তৈরি হয়। ফলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে।

এ বিষয়ে জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, নতুন কূপ খননের উদ্যোগ দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রমে শুধু দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, জ্বালানি অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো গেলে নতুন গ্যাসের মজুত শনাক্ত এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ বাড়তে পারে।

সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও নতুন কূপ খননের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। পরবর্তী সময়ে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে শুধু কূপ খননের সংখ্যা বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। নতুন কূপের অবস্থান নির্বাচন, ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ, খনন প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উৎপাদিত গ্যাস পরিবহনের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জ্বালানি প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ হলে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি প্রত্যাশিত উৎপাদন থেকেও দেশ বঞ্চিত হতে পারে।

৫৯২ কোটি টাকার তিতাস প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হলে এর বাস্তবায়ন কার্যক্রম আরও আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যাবে। প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম কূপ থেকে দ্রুত উৎপাদন শুরু এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় কূপ চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অনুমোদন, অর্থায়ন, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন অর্জনের ওপর। দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশীয় গ্যাসসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com