কুমিল্লার বুড়িচংয়ে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর আদনান আলতাফ (২৮) নামে এক ভারতীয় মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকালে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন একটি জলাশয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সোমবার রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁকে খুঁজছিলেন পরিবারের সদস্য, কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দুই দিন ধরে সন্ধান চালানোর পর তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শোকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নিহত আদনান আলতাফ কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কাবিলা এলাকায় অবস্থিত ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাবার নাম আলতাফ হোসাইন রাথার। পরিবারের বাড়ি ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার বুনপাড়া, দাঙ্গালপাড়ায়। চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনার জন্য তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। তাঁর আকস্মিক নিখোঁজ হওয়া এবং পরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার, ২ নভেম্বর রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে আদনান ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে একটি ভারতীয় খাবারের হোটেলে যান। এরপর রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে তিনি নিখোঁজ হন। ওই সময়ের পর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বজনেরা। একপর্যায়ে তাঁর সন্ধান চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
আদনানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বুড়িচং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কলেজ কর্তৃপক্ষও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সোমবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে বুধবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন জলাশয়ে গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদনান নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর পুলিশ বিভিন্নভাবে তাঁকে খুঁজেছে। বুধবার সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে জলাশয়ে মরদেহ থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং সেখান থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান শাহ মো. সেলিম জানান, আদনান কিছুটা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এ কারণে তাঁর মাকে সঙ্গে রেখে ক্যাম্পাসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। তবে নিখোঁজ হওয়ার পর কীভাবে তিনি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে দূরের জলাশয়ে পৌঁছালেন, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটির সময়ক্রম বিবেচনায় কয়েকটি বিষয় তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সোমবার রাতে ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার পর আদনান কোথায় গিয়েছিলেন, খাবারের হোটেল থেকে বের হওয়ার পর তাঁর চলাচলের পথ কী ছিল এবং রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে নিখোঁজ হওয়ার আগে বা পরে তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকার সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আদনানের পরিবারের জন্য ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একজন শিক্ষার্থী বিদেশে থেকে পড়াশোনা করছিলেন। তাঁর নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগের মধ্যেই নিখোঁজ হওয়ার খবর আসে। স্বজনেরা তাঁর সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেন। কিন্তু দুই দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর পরিবারকে যে গভীর শোকের মুখে ফেলেছে, তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকা অবস্থায় তাঁর চিকিৎসা ও পড়াশোনার পরিবেশে কী ঘটেছিল, তা জানার আগ্রহও এখন স্বজনদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের শিক্ষাজীবন নির্বিঘ্ন রাখতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আবাসন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। আদনানের মৃত্যুর ঘটনা এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় আনতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা। জলাশয় থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিজে থেকেই মৃত্যুর ধরন বা পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি হতে পারে না। এটি দুর্ঘটনা, অসুস্থতাজনিত ঘটনা, নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন যথাযথ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফল। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। আদনান শেষবার কোথায় ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন এবং কীভাবে তিনি জলাশয়ের কাছে পৌঁছালেন—এসব তথ্য উদ্ঘাটিত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
দুই দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর একজন তরুণ মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় মানুষের কাছেও গভীর উদ্বেগের বিষয়। শোকাহত পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা এবং ঘটনার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া। তদন্তের মাধ্যমে সব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের পরবর্তী তদন্তের অগ্রগতিই এখন নির্ধারণ করবে আদনান আলতাফের মৃত্যুর রহস্য কতটা স্পষ্ট হয়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত