যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ভোট গণনার সর্বশেষ পর্যায়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইদ তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের চেয়ে প্রায় এক লাখ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। ৬০ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে পাওয়া এই ব্যবধান নির্বাচনী লড়াইয়ে আল-সাইদকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে ভোট গণনা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, আল-সাইদ পেয়েছেন ১৬ লাখ ২১ হাজার ৯৭৯ ভোট। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের ভোটসংখ্যা ১৫ লাখ ২২ হাজার ২১৮। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৭৬১ ভোটে। গণনার এই পর্যায়ে আল-সাইদের এগিয়ে থাকা ডেমোক্র্যাট শিবিরে আশাবাদ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে জয় নিশ্চিত করতে রিপাবলিকান শিবিরও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
মিশিগানের এই সিনেট নির্বাচন কেবল দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর হিসাব-নিকাশ। সিনেটে দলীয় শক্তির ভারসাম্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান এবং আগামী দিনের নীতিনির্ধারণী লড়াই—সবকিছুর ওপর এই আসনের ফলাফলের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের জন্য আসনটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নির্বাচনের দিকে জাতীয় পর্যায়েও নজর রয়েছে।
আবদুল আল-সাইদ পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনী প্রচারে তিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, নির্বাচনে অর্থের প্রভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রচারের অন্যতম আলোচিত অঙ্গীকার ছিল সবার জন্য মেডিকেয়ার বা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ধারণা। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনী অর্থায়নে সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি সামনে এনেছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স একজন সাবেক কংগ্রেস সদস্য। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলীয় সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল রিপাবলিকান ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং মধ্যপন্থী ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন পাওয়া। বিশেষ করে যেসব ভোটার অতীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার ওপর রজার্সের প্রচারশিবির গুরুত্ব দিয়েছে।
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ডেমোক্র্যাট নেতা হ্যালি স্টিভেন্সের অবস্থান পরিবর্তন। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে আল-সাইদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্টিভেন্স মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে নিজ দলের প্রার্থীকে বাদ দিয়ে রিপাবলিকান রজার্সের প্রতি সমর্থন জানান। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাট শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। দলীয় রাজনীতিতে এমন প্রকাশ্য অবস্থান পরিবর্তন নির্বাচনের প্রচারকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
স্টিভেন্স তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে আল-সাইদের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর এই অবস্থান ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বরং দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়ার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়। এতে আল-সাইদের প্রতি সমর্থন আরও সংহত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে নির্বাচনী পরিস্থিতি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এই নির্বাচনে বাইরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিপুল অর্থ ব্যয়ও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই পক্ষই নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার জোরদার করতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। বিজ্ঞাপন, প্রচারসভা, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি এবং ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর নানা উদ্যোগে ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে মিশিগানের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অঙ্গরাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
আল-সাইদের প্রচারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রচলিত ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে আনা। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, কর্মজীবী মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় অর্থের প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এসব বিষয় ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে রজার্সের প্রচারে জাতীয় রিপাবলিকান নেতৃত্বের সমর্থন এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান নেতারা আল-সাইদের রাজনৈতিক অবস্থান, মুসলিম পরিচয় এবং ইসরায়েলবিষয়ক বক্তব্যকে প্রচারের আলোচনায় এনেছেন। তাঁদের দাবি, আল-সাইদের অবস্থান ও প্রস্তাবিত নীতিগুলো অঙ্গরাজ্যের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এসব বক্তব্য রিপাবলিকান প্রচারশিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান; এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আল-সাইদের মুসলিম পরিচয়কে নির্বাচনী প্রচারে আলোচনায় আনার বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি সংবেদনশীল মাত্রা যুক্ত করেছে। দেশটির নির্বাচনে প্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে। তবে ভোটারদের কাছে এসব ইস্যুর গুরুত্ব এক রকম নয়। কারও কাছে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রধান বিবেচ্য, আবার কেউ জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা সামাজিক মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে আল-সাইদ ও রজার্স—দুজনকেই ভিন্ন ভিন্ন ভোটারগোষ্ঠীর কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে আল-সাইদকে এগিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তবে জরিপের ফলাফল এবং ভোট গণনার বাস্তব চিত্র সব সময় এক হয় না। ভোটার উপস্থিতি, আগাম ভোটের হিসাব, শহর ও গ্রামীণ এলাকার ভোটের প্রবণতা এবং গণনা বাকি থাকা কেন্দ্রগুলোর ফল—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ব্যবধান বদলে দিতে পারে। তাই ৬০ শতাংশের বেশি ভোট গণনার পর পাওয়া ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মিশিগানের এই আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আসনটি শূন্য হয়েছে বর্তমান ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের অবসরের কারণে। ফলে নতুন সিনেটর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রতিনিধিত্বে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় এই আসনের ফলাফলও বড় রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছে। আল-সাইদ জয়ী হলে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। বিপরীতে রজার্সের জয় রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
নির্বাচনী প্রচারে বিভক্তি, ব্যক্তিগত বিরোধ, আন্তর্জাতিক ইস্যু এবং অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি—সবকিছু মিলিয়ে মিশিগানের ভোটারদের সামনে ছিল জটিল সিদ্ধান্ত। হ্যালি স্টিভেন্সের অবস্থান পরিবর্তন শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করলেও ভোটের ব্যবধানের ওপর তার প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করা সহজ নয়। আল-সাইদের এগিয়ে থাকার পেছনে তাঁর প্রচারের অর্থনৈতিক বার্তা, প্রগতিশীল নীতির প্রতি সমর্থন এবং ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সংহতি ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে—একটি ঘটনাকে এককভাবে ফলাফলের জন্য দায়ী করা যথাযথ হবে না।
সব মিলিয়ে মিশিগানের সিনেট নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়েছে। প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধান আল-সাইদকে এগিয়ে রাখলেও বাকি ভোট গণনা এবং আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণাই শেষ কথা। এই ফল শুধু একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; একই সঙ্গে মিশিগানে দলীয় শক্তির অবস্থান এবং ওয়াশিংটনে সিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। এখন তাই দুই শিবিরের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের নজর ভোট গণনার শেষ ধাপের দিকে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত