গাজীপুরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ ৪

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
গাজীপুরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ ৪
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার রি-টেস্টিং সেন্টারে গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে চারজন দগ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী আহাদের শরীরের ৫৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। দগ্ধ চারজনকেই উদ্ধার করে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। বুধবার রাতে ঘটা এ দুর্ঘটনায় কর্মস্থলের নিরাপত্তা, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধের বিষয়গুলো আবারও সামনে এসেছে।

বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় এলাকায় রিয়াজ ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন ইউনাইটেড সিলিন্ডার রি-টেস্টিং সেন্টার-২-এ আগুনের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হয়ে কোনোভাবে আগুনের সংস্পর্শে আসায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে গ্যাস লিকেজ হয়েছিল এবং কীভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তা বিস্তারিতভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সিলিন্ডার রি-টেস্টিং সেন্টারের মতো স্থানে গ্যাসের উপস্থিতি ও দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে ভোগড়া মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। দ্রুত উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনার ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের সদস্য তালহা বিন জসিম জানান, অগ্নিকাণ্ডে চারজন দগ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী আব্দুল্লাহর শরীরের ২০ শতাংশ, ১৯ বছর বয়সী আহাদের ৫৫ শতাংশ, ২৬ বছর বয়সী আশরাফুলের ১৫ শতাংশ এবং ২৫ বছর বয়সী নাঈমের শরীরের ৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ হওয়ার মাত্রা বিবেচনায় তাঁদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

তিনি জানান, দগ্ধদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আব্দুল্লাহ ও আহাদকে মেডিকেল হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এমএইচডিইউ) রাখা হয়েছে। নাঈমকে জরুরি বিভাগে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। শরীরের ৫৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় আহাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দগ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিস্থিতি তাঁদের পোড়ার পরিমাণ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলে সংক্রমণ, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে তাঁদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া জরুরি।

ভোগড়া মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. হিরণ মিয়া জানান, রাত ৮টা ৪০ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার থেকে লিকেজ হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রথমদিকে দুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে দগ্ধ চারজনের তথ্য পাওয়া যায়। দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে আগুন লাগার মুহূর্তে সেখানে কী ধরনের কাজ চলছিল, সিলিন্ডারগুলো কী অবস্থায় ছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

গ্যাস সিলিন্ডার রি-টেস্টিং সেন্টারে বিভিন্ন ধরনের সিলিন্ডারের নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করা হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের উপস্থিতি, সিলিন্ডারের চাপ এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। সামান্য অসাবধানতা, ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ কিংবা গ্যাস নির্গমনের ঘটনা বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বদ্ধ বা পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নেই এমন স্থানে গ্যাস জমে থাকলে আগুনের উৎসের সংস্পর্শে এসে তা দ্রুত জ্বলে উঠতে পারে। এ কারণে সিলিন্ডার পরীক্ষা ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য নয়, আশপাশের মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ, পরিবহন, পরীক্ষা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ না করা হলে আগুন কিংবা বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, গ্যাস লিকেজ শনাক্তের ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং কর্মীদের সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে বিভিন্ন ধরনের কারখানা, ওয়ার্কশপ, জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র এবং সিলিন্ডারসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব স্থানে কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্যাস ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি এবং নিরাপত্তা মান বজায় রাখা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

নাওজোড়ের এ ঘটনায় চারজনের দগ্ধ হওয়ার খবর স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আহতদের মধ্যে একজনের শরীরের অর্ধেকেরও বেশি পুড়ে যাওয়ায় তাঁর চিকিৎসা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ থাকার কথা। অন্য তিনজনও দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সহায়তা হতে পারে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দগ্ধ চারজনের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা। গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হলেও কীভাবে লিকেজ ঘটেছে, সিলিন্ডার বা সংযোগে কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে দায় বা অবহেলার কোনো বিষয় উঠে এলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

গাজীপুরের এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই শুধু দুর্ঘটনার পর আগুন নিয়ন্ত্রণ বা আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত, নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে কর্মীদের জীবন সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমানো সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com