গ্রাউন্ড সার্ভিস উন্নয়নে ২২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ইউএস-বাংলার

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
গ্রাউন্ড সার্ভিস উন্নয়নে ২২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ইউএস-বাংলার
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে নিজেদের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে গ্রাউন্ড সার্ভিস আধুনিকায়নে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের সেবা, যাত্রী ওঠানামা, ব্যাগেজ পরিবহন এবং ফ্লাইট পরিচালনার সহায়ক কার্যক্রম আরও দ্রুত ও দক্ষ করতে প্রায় ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে এ খাতে ১২ মিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নতুন ১৪৬টি গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ৮০টি বৈদ্যুতিক যান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিমান পরিবহন খাতে একটি ফ্লাইটের সফল পরিচালনা কেবল উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণের ওপর নির্ভর করে না। যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামা, লাগেজ যথাসময়ে উড়োজাহাজে তোলা ও নামানো, উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা সরবরাহ এবং রানওয়ে ও র‌্যাম্প এলাকায় বিভিন্ন সহায়ক কাজের ওপরও ফ্লাইট পরিচালনার সময়ানুবর্তিতা নির্ভরশীল। এসব কাজের সমন্বিত ব্যবস্থাপনাকে গ্রাউন্ড অপারেশন বলা হয়। ফলে আধুনিক সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল ছাড়া বড় পরিসরে বিমান চলাচল পরিচালনা করা কঠিন। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এই সহায়ক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫৯০টি গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে আরও ১৪৬টি সরঞ্জাম যুক্ত হলে মোট সরঞ্জামের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নতুন সরঞ্জামের মধ্যে থাকবে উড়োজাহাজ পুশব্যাক ট্রাক্টর ও টোবার, ব্যাগেজ বেল্ট লোডার, ব্যাগেজ ট্রাক্টর, যাত্রী ওঠানামার সিঁড়ি, গ্রাউন্ড পাওয়ার ইউনিট, এয়ার স্টার্ট ইউনিট, ক্যাটারিং ট্রাক, পানি সরবরাহ এবং ল্যাভাটরি সার্ভিস ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের র‌্যাম্প সাপোর্ট সরঞ্জাম।

এসব যন্ত্রপাতি বিমানবন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উড়োজাহাজ অবতরণের পর যাত্রী নামানো, লাগেজ খালাস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার ও পানীয় সরবরাহ এবং পরবর্তী ফ্লাইটের প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। পুশব্যাক ট্রাক্টর উড়োজাহাজকে পার্কিং অবস্থান থেকে পেছনের দিকে সরিয়ে নির্ধারিত পথে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। ব্যাগেজ বেল্ট লোডার ও ট্রাক্টর লাগেজ পরিবহনে সহায়তা করে। অন্যদিকে গ্রাউন্ড পাওয়ার ইউনিট ও এয়ার স্টার্ট ইউনিট উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। এসব সরঞ্জামের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়লে একই সময়ে একাধিক উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সার্ভিস পরিচালনা সহজ হতে পারে।

ইউএস-বাংলার এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির উড়োজাহাজ বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগও যুক্ত রয়েছে। বর্তমানে এয়ারলাইনসটির বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭ সিরিজের উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উড়োজাহাজের সংখ্যা ও ফ্লাইট পরিচালনার পরিসর বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান গ্রাউন্ড সার্ভিস অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। নতুন সরঞ্জাম যুক্ত করার উদ্যোগকে তাই বহর সম্প্রসারণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।

শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোই নয়, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে ইউএস-বাংলার। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ১০টি দেশের ১৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর সঙ্গে আরও প্রায় ১৬টি নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নতুন গন্তব্য চালু হলে যাত্রী পরিবহন, উড়োজাহাজের ব্যবহার এবং বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। তাই ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরঞ্জাম, জনবল ও পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এয়ারলাইনসটি।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম ও সিলেটে আঞ্চলিক হাব গড়ে তোলার বিষয়টিও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীদের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ করতে আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের হাব পরিচালনার জন্য শুধু ফ্লাইটের ব্যবস্থা করলেই হবে না; প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট, প্রশিক্ষিত কর্মী, যাত্রীসেবা এবং লাগেজ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত অবকাঠামো। এ কারণে গ্রাউন্ড সার্ভিসে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে ইউএস-বাংলা।

পরিবেশবান্ধব বিমানবন্দর কার্যক্রম গড়ে তোলার লক্ষ্যেও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮০টি ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক যান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব যানবাহন ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো স্থাপনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইনসটি। বিমানবন্দরের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক কাজে ব্যবহৃত যানবাহনের একটি অংশ বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালিত হলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বিমানবন্দর এলাকায় যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও স্থানীয় পর্যায়ের কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সহায়ক হতে পারে এ উদ্যোগ।

ইউএস-বাংলার দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন বড় বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড অপারেশনে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের জন্য চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, লস অ্যাঞ্জেলেস, টরন্টো পিয়ারসন, লন্ডন হিথ্রো, আমস্টারডাম, দুবাই, দোহা, আবুধাবি, জেদ্দা, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও ব্যাংককের বিমানবন্দর এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রয়োজনীয় চার্জিং সুবিধা ও পরিচালনাগত অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে গ্রাউন্ড অপারেশনে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের সুফল পাওয়া সম্ভব।

তবে বৈদ্যুতিক যান চালুর ক্ষেত্রে চার্জিং স্টেশনের পাশাপাশি যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারির কার্যক্ষমতা, চার্জ দেওয়ার সময় এবং প্রতিদিনের কাজের চাপ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিমানবন্দরের মতো ব্যস্ত স্থানে যানবাহনগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজে লাগাতে হলে পর্যাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট ও বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এ ছাড়া কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে ৮০টি বৈদ্যুতিক যান চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইউএস-বাংলা জানিয়েছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণসহ বিমানবন্দর আধুনিকায়ন এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তারা। বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নত হলে যাত্রীসেবা ও ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে এয়ারলাইনসগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, জনবল এবং গ্রাউন্ড সাপোর্টও সমানভাবে আধুনিক হওয়া প্রয়োজন।

বিমান পরিবহন খাতে সময়ানুবর্তিতা যাত্রীদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট ছাড়তে না পারলে যাত্রীদের পরবর্তী সংযোগ ফ্লাইট, কর্মসূচি কিংবা ব্যক্তিগত পরিকল্পনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। গ্রাউন্ড অপারেশনের কোনো একটি ধাপে বিলম্ব হলেও তার প্রভাব পুরো ফ্লাইট সূচিতে পড়তে পারে। ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী ওঠানামা, উড়োজাহাজ প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সময়মতো সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে পরিচালনাগত জটিলতা বাড়ে। আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত করার মাধ্যমে এসব কাজের গতি ও সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউএস-বাংলার গ্রাউন্ড সার্ভিস সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নতুন সরঞ্জাম যথাসময়ে যুক্ত করা, সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ বহর ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীসেবার মান, ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা এবং পরিবেশবান্ধব পরিচালনার গুরুত্ব বাড়ছে। ইউএস-বাংলার নতুন উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে পরিকল্পনার ঘোষণা থেকে বাস্তব ফলাফল আসতে হলে বিনিয়োগের প্রতিটি ধাপ কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে হবে। নতুন গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট ও বৈদ্যুতিক যান চালু হলে সেগুলো যাত্রীসেবায় কতটা উন্নতি আনে, ফ্লাইট পরিচালনায় কতটা সময় সাশ্রয় করে এবং পরিবেশগত প্রভাব কমাতে কতটা ভূমিকা রাখে—তা ভবিষ্যতে পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com