কারামুক্তির পর কটিয়াদীতে মেজর আখতারকে ঘিরে জনসমাগম

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
কারামুক্তির পর কটিয়াদীতে মেজর আখতারকে ঘিরে জনসমাগম
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে কারামুক্তির পর মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিজ এলাকায় পৌঁছালে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। শুক্রবার সকালে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে আয়োজিত এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতি, মোটরসাইকেলের বহর এবং শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজনটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আখতারুজ্জামান রঞ্জন তাঁর কারাভোগের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁকে এক মাস দুই দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তবে কারাবাস কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও তিনি পিছপা হবেন না।

তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা এবং দলীয় অবস্থান পরিবর্তনের প্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্ব পায়। দীর্ঘ চার দশক বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই রাজনৈতিক জীবন তাঁর কাছে একসময় বিশাল নদীর মতো ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদীতে চর পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, অতীতের রাজনৈতিক জীবনকে তিনি ভুল বলে মনে করছেন না; বরং জীবনের একটি নতুন পর্যায়ে এসে নিজের রাজনৈতিক পথ পরিবর্তন করেছেন।

এরপর তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন। আখতারুজ্জামান রঞ্জন বলেন, জীবনের একটি পর্যায়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাঁর কাছে আরেকটি বিশাল নদীর মতো, যেখানে তিনি নতুনভাবে পথচলা শুরু করেছেন। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই রাজনৈতিক যাত্রা একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক জীবনে মত ও অবস্থানের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান পরিবর্তিত হবে না। কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে দেখছেন না। বরং এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান এবং সত্যের জয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এর আগে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেন আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি কটিয়াদী-মঠখোলা সড়কের কটিয়াদী সীমান্ত এলাকায় পৌঁছালে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় শতাধিক মোটরসাইকেলের একটি বহর নিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে মোটরসাইকেলের বহরসহ একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি বিভিন্ন সড়ক অতিক্রম করে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। সেখানেই তাঁর জন্য গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল।

বাসস্ট্যান্ডে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। বিভিন্ন স্লোগানের মধ্য দিয়ে সমর্থকেরা তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থন ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কারামুক্তির পর নিজ এলাকায় ফিরে পেয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা গেছে, পুরো আয়োজনেই তার প্রতিফলন ছিল।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মোজাম্মেল হক জোয়ারদার। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির সাইদুল হক বিএসসি, উপজেলা সেক্রেটারি মাহমুদুল হাসান, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মোড়ল এবং উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

আখতারুজ্জামান রঞ্জনের রাজনৈতিক পরিচয় কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পরপর দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় অবস্থান ও নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা নিজেও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হন আখতারুজ্জামান। তাঁর এই সিদ্ধান্ত কিশোরগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার পর জামায়াতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর দল পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে সমর্থন ও ভিন্নমত—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াও দেখা গিয়েছিল। তবে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নিজের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেন।

তাঁর কারামুক্তির ঘটনাটিও সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। গত ১ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ ও জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের বাকবিতণ্ডার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি এবং নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডও মঞ্জুর করা হয়েছিল। প্রায় এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে ৩ নভেম্বর সকালে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে জামিন পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে আবেদন করলেও সেখানে নতুন কোনো আদেশ না আসায় জামিন কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষ করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

কারামুক্তির পর তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাগত জানানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে। ঢাকায় কারাফটকে দলীয় নেতাদের উপস্থিতির পর এবার নিজ এলাকায় তাঁকে ঘিরে বড় ধরনের সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগের পাশাপাশি মামলার বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিবেচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে। একইভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা সব রাজনৈতিক দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

কটিয়াদীর গণসংবর্ধনায় আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয়, অতীতের দলীয় অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান। বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেও তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে এনেছেন। অন্যদিকে কারাভোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভবিষ্যতেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার ঘোষণা দিয়েছেন।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সংবর্ধনা তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার নতুন একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখন কটিয়াদীর রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর পরবর্তী কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বাধা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে চান মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com