দিনের ভোট রাতে হওয়ার সংস্কৃতি আর নেই: ত্রাণমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
দিনের ভোট রাতে হওয়ার সংস্কৃতি আর নেই: ত্রাণমন্ত্রী
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং এখন আর দিনের ভোট রাতে হওয়ার পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তাঁর মতে, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনেও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে শুধু নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলেই চলবে না, রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সুশাসন, জবাবদিহি ও জনসেবার মান নিশ্চিত করতে একই ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় মন্ত্রী নির্বাচনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীলতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের পরিবেশ এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, জনগণের সেবায় কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য হবে না।

নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। তাঁর ভাষায়, এখন আর দিনের ভোট রাতে হয় না। তিনি মনে করেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন ধরে রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে।

তবে মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল গুরুত্ব ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, একইভাবে রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সরকারি সেবার প্রতিটি স্তরে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। নাগরিকেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যেন হয়রানি, অবহেলা কিংবা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি না হন, সে বিষয়েও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

৫ আগস্টের পর দেশের মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তরুণ, যুবক ও কৃষকেরা বাংলাদেশের পরিবর্তনের প্রত্যাশায় জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় সাধারণ মানুষের অবদান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বারবার পথ হারিয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে কেবল সাময়িক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করতে হলে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, কার্যকর প্রশাসন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে হবে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত না থাকলে অপরাধপ্রবণতা, অপশাসন ও অপব্যবস্থাপনার মতো সমস্যা তৈরি হয়। এ কারণে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।

মতবিনিময় সভায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও কঠোর অবস্থান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন। জনগণের সেবায় কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না। তাঁর এই বক্তব্যে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা, কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সরকারি দপ্তরগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসনিক সেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাগরিকদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবার, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং জরুরি সেবার প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের জন্য সরকারি সেবার মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি দপ্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, হাসপাতাল এমন একটি জায়গা, যেখানে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালেই নোংরা পরিবেশ দেখা যায়।

মন্ত্রী বলেন, হাসপাতালগুলো সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কথা হলেও সেখানে অনেক সময় সবচেয়ে বেশি অপরিচ্ছন্নতা দেখা যায়। ফলে সুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে উল্টো অসুস্থ হয়ে ফেরার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। হাসপাতালের পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং রোগীদের সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে—তাঁর বক্তব্যে এমন প্রত্যাশাই উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা শুধু সৌন্দর্য বা পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল থাকেন। তাঁদের জন্য অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়েও একই ধরনের নির্দেশনা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শিক্ষার্থীরা দিনের বড় একটি সময় বিদ্যালয় ও কলেজে কাটায়। ফলে শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, পানির ব্যবস্থা এবং পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিচ্ছন্নতা তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরির সুযোগও বাড়ে।

নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার বিষয়েও সভায় বক্তব্য দেন আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, একটি প্রজন্মের ক্ষতি হলে পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তরুণদের বিকাশ, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলা ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তরুণ প্রজন্মকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সৃজনশীল উদ্যোগে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এসব কার্যক্রম তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দলগত কাজ, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। মন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন প্রজন্মের জন্য এমন একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা এবং তরুণদের বিকাশ—বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যকর ভূমিকার ওপরও তা নির্ভর করে।

মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি দপ্তরগুলোতে দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, নাগরিক সেবায় অবহেলা বন্ধ এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তা পর্যবেক্ষণ করবেন সাধারণ মানুষ। কারণ রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের সুফল শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com