সংস্কার বাস্তবায়নে নতুন কমিটি গড়ছে ১১-দলীয় ঐক্য

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
সংস্কার বাস্তবায়নে নতুন কমিটি গড়ছে ১১-দলীয় ঐক্য
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিকে সামনে রেখে সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও জনমতভিত্তিক চাপ বাড়ানোর নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাবিত এই কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি আরও জোরালো করা, জনগণকে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে সচেতন করা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বৃহত্তর আন্দোলনের পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করছে বিরোধী জোট।

রাজনৈতিক অঙ্গনে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের ফল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধী জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারপ্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর রয়েছে। তাঁদের দাবি, সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এ দাবি আদায়ে শুধু সংসদীয় আলোচনা নয়, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিও প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত কমিটির মূল লক্ষ্য হবে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে জনমত তৈরি করা। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিরোধী জোটের নেতারা মনে করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিও বৃহত্তর সামাজিক ও নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন।

জোট-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে আলোচনা করা হয়। সেখানে কমিটির সম্ভাব্য সদস্য, কাঠামো ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক খসড়া রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আলোচনায় কমিটির সম্ভাব্য নাম হিসেবে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি’ অথবা ‘সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ প্রস্তাব করা হয়েছে। সদস্যসংখ্যা ১৫ থেকে ২১ জনের মধ্যে রাখার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে এখনো নাম, সদস্যসংখ্যা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

প্রস্তাবিত কমিটিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় সারির নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, আইনজীবী, শিক্ষক, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবিকে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে ১১-দলীয় ঐক্য।

কমিটিতে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে যাঁদের নাম আলোচনায় এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির। জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি তাসমিয়া প্রধানের নাম আলোচনায় রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমকেও কমিটিতে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য। তবে এসব নাম এখনো চূড়ান্ত সদস্যতালিকা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই।

বিরোধী জোটের নেতারা মনে করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হলে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের মানবিক ও সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। তাঁদের মতে, অভ্যুত্থানের সময় মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান ও শাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত কমিটির কর্মপরিকল্পনায় জনসংযোগ ও মতবিনিময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সভা আয়োজন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ এবং আইনজীবী, কূটনীতিক, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া গোলটেবিল বৈঠক, নাগরিক সংলাপ ও মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গণভোটের রায়, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা সম্পর্কে জনগণকে বিস্তারিত জানাতে চায় জোটটি।

জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের বক্তব্যে নতুন উদ্যোগের পেছনের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে তাঁদের একটি দায়িত্ব রয়েছে এবং সেই দায়িত্ব পালন না করে নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। তবে তিনি জানিয়েছেন, সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

১১-দলীয় ঐক্যভুক্ত একটি দলের শীর্ষ নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণকে সচেতন করা এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাই বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান করণীয়। তাঁর মতে, সরকারকে গণভোটের রায় ও সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিরোধের পেছনে রয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল। ওই নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে গণভোটে বৈধ ভোটের ৬৮ শতাংশ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে পড়ে। এই ফলকে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

বিরোধী জোটের অবস্থান হলো, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে এবং সেই পরিষদের মাধ্যমেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে আলাদা শপথ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেননি। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদ সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত ১২ সদস্যের ওই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে পরিসর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। কমিটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। তাদের বক্তব্য, সরকারের নেওয়া বর্তমান উদ্যোগ গণভোটের রায় বাস্তবায়নের যথাযথ পথ নয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সরকার যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে, সেটিকে তাঁরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই অগ্রসর হতে হবে। নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগের পেছনেও এই দাবিকে সামনে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারবে, তা নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত কাঠামো, কর্মসূচি এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরের নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের ভূমিকা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যতে কী ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়, তা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ১১-দলীয় ঐক্যের নতুন জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী জোটের আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে সামনে এসেছে। কমিটি চূড়ান্ত হলে জনমত গঠন, নাগরিক সংলাপ ও মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে উদ্যোগী করার চেষ্টা চালানো হবে। তবে এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করবে, নাকি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব আরও বাড়াবে—তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com