৭৫৭ জনের নিয়োগ বাতিল, ১৮ বছর পরও অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
৭৫৭ জনের নিয়োগ বাতিল, ১৮ বছর পরও অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ

প্রকাশ:০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের জন্য ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে হাজারো প্রার্থী পরীক্ষা দেন। লিখিত, মৌখিক, শারীরিক যাচাই-বাছাই ও মেডিকেল পরীক্ষার পর ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৭৫৭ জন প্রার্থী পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরম পূরণ করে অপেক্ষমাণ ছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। কিন্তু হঠাৎ করেই এক বিশেষ গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তাদের ‘বিএনপি-জামায়াতের কর্মী’ আখ্যা দিয়ে পুরো ব্যাচের নিয়োগ স্থগিত করা হয়। তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ ও পরবর্তীতে আইজিপি বেনজীর আহমেদের সিদ্ধান্তে সেই নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়।

এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিয়োগবঞ্চিতরা ন্যায়বিচারের জন্য বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন কিংবা স্মারকলিপি দেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত মেলেনি তাদের। পুলিশের বাধা, গ্রেপ্তার ও বয়স সীমার কারণে তাদের অধিকাংশই আর সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাননি। কেউ কেউ বিকল্প জীবিকার সন্ধান পেয়েছেন ওষুধ কোম্পানি, গার্মেন্টস বা অন্যান্য পেশায়, আবার অনেকেই জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত অপেক্ষা করে গেছেন নিয়োগ পাওয়ার আশায়। কয়েকজন ইতিমধ্যেই প্রয়াত হয়েছেন।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তী সরকারের আগমনের পর তারা আবারও আশাবাদী হয়ে ওঠেন। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, সচিবালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দেন বঞ্চিত প্রার্থীরা। পরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে তাদের প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। বৈঠকে জানা যায়, ৭৫৭ জনের মধ্যে ৩৩০ জন এখনও চাকরিতে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এসআই পদে ২০৭ জন এবং সার্জেন্ট পদে ১২৩ জন। উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে তারা নতুন করে আবেদনও করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে মতামত চায়—২০০৭ সালে দলীয় বিবেচনায় বাতিল হওয়া সেই ব্যাচকে পুনর্বহালের সুযোগ দেওয়া যায় কি না। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মতামত জানায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯১ সালে একইভাবে সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ বাতিল হয়েছিল এবং ১৯৯৭ সালে বয়স প্রমার্জন করে তাদের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ বছরের বয়স ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের নিয়োগপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ বছরের বয়স ছাড় প্রয়োজন হবে, যা প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের ‘বিশেষ ব্যাচ’ হিসেবে বিবেচনা করে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। সেই বিধিমালার আওতায় নতুন পদ সৃজন করে এবং তাদের মেডিকেল ও প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হওয়ার শর্তে পুনর্বহালের সুপারিশ করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বঞ্চিতরা বলছেন, তাদের জীবন থেকে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় চলে গেছে অন্যায়ের কারণে। ১৯৯১ সালের মতো তারাও সমাধান চান। তারা আশা করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করবে এবং আলাদা বিধিমালার মাধ্যমে হলেও তাদের চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করবে।

এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে ৭৫৭ জন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীর ভাগ্য এখনও ঝুলে আছে প্রশাসনিক গোলকধাঁধায়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ এই বিতর্ক শুধুমাত্র একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি দৃষ্টান্ত। এই প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু সমাধান হলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, আর ব্যর্থ হলে তা থেকে যাবে একটি তিক্ত অধ্যায় হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত