রাজিবপুরে টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়ম ও হরিলুট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
রাজিবপুরে টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়ম ও হরিলুট

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজিবপুর। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অধিকাংশ প্রকল্পে হরিলুট হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণে জানা গেছে। উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবায়নের দিক থেকে প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম নগন্য বা আংশিক। অনেক প্রকল্প কেবল কাগজে বন্দি এবং বাস্তবিক কাজের কোনো হদিস নেই।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মোট ১৯৫টি কাবিটা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত তিন কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ১২৩ টাকার বেশির ভাগই হরিলুট হয়েছে। অনেক প্রকল্পের নামমাত্র কাজের হিসাব রয়েছে, কোনোটিরই প্রাথমিক খরচ বা এস্টিমেট তৈরি হয়নি। এ ছাড়া কাবিখা প্রকল্পের ২৯টি প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দ ২১১ দশমিক ৩৭৬ টন চালের অধিকাংশই কাগজে ফাইলবন্দি রেখে আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের বিল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের ফলে প্রকৃত কাজের চেয়ে প্রকল্পের অর্থ অনেকাংশে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে ভাগ-বণ্টন হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিল তুলতে স্থানীয় প্রার্থীদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে দিতে হয়েছে। সূত্রের বরাতে জানা যায়, কাচারীপাড়া লুৎফরের বাড়ি থেকে রেণু বেগমের বাড়ি পর্যন্ত মাটি ভরাটে তিন লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত কাজ হয়নি। কলেজপাড়া মজিবরের বাড়ি থেকে আজিবরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে কাচারীপাড়া বিদ্যুৎ মাস্টারের বাড়ি থেকে ফারুকের বাড়ি রাস্তায় মাটি ভরাটে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, কলেজপাড়া শরবতের বাড়ি থেকে হানিফ আলীর বাড়ি পর্যন্ত গাইড ওয়াল ও মাটি ভরাটে এক লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের কার্যক্রম অনুপস্থিত। উল্লিখিত দশটি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি সাতটি প্রকল্প কেবল কাগজে সীমিত থাকায় বরাদ্দ অর্থ হরিলুট হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “আমি নিজে একটি মাত্র কাজ করেছি, বাকি কাজ ছাত্ররা করেছে।” একইভাবে ৪ নম্বর ওয়ার্ড বালিয়ামারী বাজারপাড়ায় দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে একটি প্রকল্পের কাজ হয়েছে। তবে মাটি ভরাটের কার্যক্রম এখনও সম্পন্ন হয়নি। বালিয়ামারী বাজারপাড়ার আজিবরের ছেলে মোনতার বাড়ি থেকে মতির বাড়ি পর্যন্ত গাইড ওয়াল ও মাটি ভরাটে বরাদ্দ পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার টাকার কাজ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছেন, বালিয়ামারী খেয়াঘাটের পশ্চিম পাশে টিআর মাটি ভরাট বাবদ বরাদ্দ থাকা দশ টনের কাজ সম্পন্ন হয়নি। খেয়াঘাটের যাত্রী ছাউনি ও গাইড ওয়াল নির্মাণে বরাদ্দ দুই লাখ ছয় হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে নামমাত্র একটি ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সরদার মোড় থেকে পশ্চিমে আলমের বাড়ি পর্যন্ত গাইড ওয়াল ও মাটি ভরাট প্রকল্পও কেবল ভুয়া প্রকল্প হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের বালিয়ামারী বাজার কসাইখানার পাশে গাইড ওয়াল ও মাটি ভরাটে বরাদ্দ পাঁচ টনের কাজও করা হয়নি।

জাউনিয়ারচর গুচ্ছগ্রামের বাবর আলীর বাড়ি থেকে মিয়াপাড়া মসজিদ পর্যন্ত গাইড ওয়াল ও মাটি ভরাটে বরাদ্দ তিন লাখ ৪১ হাজার টাকার কোনো কাজ হয়নি। রাজিবপুর পোস্ট অফিসের পাশে গাইড ওয়ালসহ মাটি ভরাটে দুই লাখ টাকার কার্যক্রমও অনুপস্থিত। সদর ইউনিয়নের করাতীপাড়া ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সাতটি প্রকল্পের মধ্যে চারটির কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। মমিনুল হকের বাড়ি থেকে হামিদ মণ্ডলের বাড়ি পর্যন্ত গাইড ওয়ালে তিন লাখ ১৬ হাজার ৫৬০ টাকা এবং খোকনের বাড়ির সামনে গাইড ওয়াল নির্মাণে দেড় লাখ টাকার বরাদ্দ কেবল কাগজে সীমিত।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দিয়ারা ফকিরপাড়া গ্রামের বাদশা পাগলার বাড়ি থেকে পূর্বদিকে রাস্তা নির্মাণে বরাদ্দ ছয় লাখ ২৪ হাজার ১০০ টাকার কাজ সম্পন্ন হয়নি। একই ওয়ার্ডের বাচ্চুর বাড়ির ব্রিজ থেকে মানিকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণে বরাদ্দ দুই লাখ ৭৭ হাজার ৫৪০ টাকার কার্যক্রমও অনুপস্থিত। কোদালকাটি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বড় নফেলের বাড়ি থেকে দক্ষিণে নফেলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে বরাদ্দ দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৬ টাকার কাজও সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া কোদালকাটি ইউনিয়নের চর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পাখিউড়া বাজার থেকে খাজারঘাট ব্রিজ পর্যন্ত মেরামতে বরাদ্দ এক লাখ ৮৭ হাজার ৮৫০ টাকা, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলমিয়ার বাড়ি থেকে জুবায়ের বাড়ি রাস্তা মেরামতে পাঁচ টন চাল এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হাসানুলের বাড়ির পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণে বরাদ্দ দুই লাখ ৫৭ হাজার টাকার কোনো কাজই হয়নি।

অর্থবছরের কাজ ৩০ জুন ২০২৫-এর মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্প চেয়ারম্যানরা সময়মতো কার্যক্রম শেষ করতে পারেননি। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সব জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেন। যদিও কিছু প্রকল্পে কাজ হয়েছে, অধিকাংশ প্রকল্পের বিল প্রক্রিয়ায় পিআইও অফিস রহস্যজনকভাবে টাকা ছাড় করেছে।

নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ আসলেও প্রকল্পের বণ্টন এখনও সম্পন্ন হয়নি। রাজিবপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানান, তার জ্ঞান অনুযায়ী অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যেসব প্রকল্প করা হয়নি, সেগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে এলাহী বলেন, অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে তদন্ত করা হয়েছে। যেখানে কাজ হয়নি, সেখানকার কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজিবপুরে স্থানীয়রা মনে করছেন, টিআর-কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ কেবল কাগজে সীমিত থাকা, প্রকল্পের বাস্তবায়ন শূন্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে অনিয়ম প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করেছে। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন, তদন্ত কমিটি দ্রুত কার্যক্রম শেষ করে প্রকৃত অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে এবং ভবিষ্যতে প্রকল্পের স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত