বিমানবন্দর স্বর্ণ আত্মসাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
শর্ট টাইটেল: বিমানবন্দর স্বর্ণ আত্মসাত

প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাস্টম হাউসের লকার থেকে ৫৫ কেজি স্বর্ণ উধাও হওয়ার ঘটনা তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা দেশের ভোক্তা ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সরাসরি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনায় ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর থানায় চুরির মামলা দায়ের করেন ঢাকা কাস্টম হাউসের এয়ারপোর্ট প্রিভেন্টিভ টিমের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন। তবে তদন্তের পর যা জানা গেছে তা প্রমাণ করছে, এটি কোনো সাধারণ চুরি নয়; বরং কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সংঘটিত স্বর্ণ আত্মসাতের ঘটনা।

মামলাটি প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দর থানার পুলিশ তদন্ত করছিল। তবে বিষয়টি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখার জন্য ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয় সংস্থার তৎকালীন সদস্য ফারজানা আফরোজকে, যিনি বর্তমানে আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বর্ণগুলো প্রকৃতপক্ষে কাস্টমসের চার গুদাম কর্মকর্তা ও চার সিপাহির যৌথ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ৫৫ দশমিক ৫৩ কেজি স্বর্ণ উধাও হওয়ার খবর দেয়া হলেও, পরবর্তীতে জানা যায় প্রকৃত পরিমাণ ছিল ৬১ দশমিক ৮১৫ কেজি।

আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত গুদাম কর্মকর্তাদের নাম হলো—সাইদুল ইসলাম সাহেদ, শহিদুল ইসলাম, আকরাম শেখ ও মাসুম রানা। আর সিপাহিরা হলেন রেজাউল করিম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজাল হোসেন ও নিয়ামত হাওলাদার। তদন্ত কমিটি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এই চার গুদাম কর্মকর্তা এবং চার সিপাহি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রিপোর্টের ভিত্তিতে আত্মসাতের মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাতের ঘটনা দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমে এমন স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার, যা বাজেয়াপ্ত বা জব্দ হওয়ার পর দীর্ঘদিন বিচারকাজের জন্য রাখা হয়েছিল কিন্তু কোনো বৈধ দাবি না থাকায় কর্মকর্তারা নিজেরাই আত্মসাৎ করেন। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই ধরণের স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি।

তদন্ত কমিটি বলেছে, মোট ৩৪ দশমিক ৫১৯ কেজি স্বর্ণ ব্যাংকে না দিয়ে ট্রানজিট গুদামে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে ২৭ দশমিক ২৪১ কেজি স্বর্ণ আত্মসাৎ করা হয়, যা সাধারণত আইন অনুযায়ী যাত্রীদের আবেদন এবং শুল্ক পরিশোধের পর ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু বৈধ কোনো আবেদন না থাকায় কর্মকর্তাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

ছয়টি ডিটেনশন মেমোর (ডিএম) বিপরীতে ভিজিআর রেজিস্টারে স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর সিলমোহর থাকার পরও প্রকৃতপক্ষে তা পাঠানো হয়নি। সাইদুল ও শহিদুল আগের গুদাম কর্মকর্তা জুয়েল চক্রবর্তীর কাছ থেকে ছয়টি ডিএমের স্বর্ণ বুঝিয়ে নেন। এরপর আকরাম ও মাসুমকে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়, যারা পরবর্তীতে জাল সিল ব্যবহার করে স্বর্ণ আত্মসাৎ করেন।

২০২৩ সালের ১ আগস্ট গুদাম কর্মকর্তা সাইদুল ও শহিদুল বদলি করা হয় এবং নতুন কর্মকর্তা হিসেবে আকরাম শেখ ও মাসুম রানাকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় গুদামের পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার পুরোপুরি হস্তান্তর করা হয়নি। নবযোগদানকারী কর্মকর্তারা ২২ আগস্ট বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপর সাইদুল ও শহিদুল পুনরায় দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে ছয়টি ডিএমের স্বর্ণ উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন।

তদন্তে দেখা গেছে, নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা ছয়টি ডিএমভুক্ত স্বর্ণ খুঁজে না পাওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালেও অন্যান্য ডিএমের বিষয়ে কোনো আপত্তি করেননি। এ প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ আত্মসাতের পুরো নকশা স্পষ্ট হয়েছে।

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রানজিট ও মূল্যবান পণ্য গুদামের চার সিপাহি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। যথাযথ তল্লাশির অভাবে গুদাম থেকে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য অবৈধভাবে বের করা সম্ভব হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, স্বর্ণ চুরির আড়ালে আত্মসাতের একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

এ ঘটনা কেবল বিমানবন্দর কাস্টমসের দুর্নীতির দৃষ্টান্তই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঙ্গে জড়িত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা এবং প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে দেখানো যাচ্ছে। তদন্তে উঠে এসেছে, যে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতি এবং দায়িত্বহীনতা স্বর্ণের এই ধরনের আত্মসাতের পথ সুগম করেছে।

এরপরও কমিটি সুপারিশ করেছে, আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এটি সরকারের নজরদারি ও দায়বদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরায় ঘটতে না পারে।

এই ঘটনা দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকদের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিমানবন্দর ও কাস্টম হাউসের মতো সংস্থায় স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাব কীভাবে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে তা একবারের জন্যও বিবেচনা করা জরুরি।

প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, শুধু সাধারণ চুরি নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত পরিকল্পিত আত্মসাত দেশজুড়ে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত। এর প্রেক্ষিতে প্রশাসনকে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নয়, বরং স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত তথ্য, প্রক্রিয়া ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিশদ বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, কিভাবে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। এনবিআরের প্রতিবেদন এবং দুদকের সম্ভাব্য মামলা দেশের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনঃমূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত