সর্বশেষ :
মালদ্বীপে রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ, স্থানীয় মুদ্রায় পাঠানোর সুযোগ নিয়ে বৈঠক তারেক রহমানের সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা ‘এটা ঘটবেই’: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শক পাঠানো হবে, জানাল আইএইএ ২৪ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েও হামের টিকা পায়নি অনেক শিশু, উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্যখাতে টাঙ্গাইলে ভাইরাল কৃষক কবির হোসেনের দাফন সম্পন্ন, শেষ বিদায়ে শোকে ভারী জনপদ সঠিক নীতিসহায়তা পেলে রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা: বাণিজ্যমন্ত্রী মশার কয়েলের আগুনে পুড়ল গোয়ালঘর, প্রাণ গেল তিন গরুর, দগ্ধ কৃষক গোপালগঞ্জে মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল যুবকের “রিলিফ নয়, স্থায়ী সমাধান চাই” — তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ

বিদেশি বিনিয়োগে ধস: তিন মাসেই কমেছে ৬২ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
বিদেশি বিনিয়োগে ধস: তিন মাসেই কমেছে ৬২ শতাংশ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ খাতে আবারও বড় ধাক্কা লেগেছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে গেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। যদিও বছরের ব্যবধানে কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এই ধস উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৩০ কোটি ৩২ লাখ ডলার, যেখানে বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এই পরিমাণ ছিল ৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে হিসেবে বিনিয়োগের পতন ঘটেছে প্রায় ৬১ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিনিয়োগ বেড়েছে ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ, বছরওয়ারি হিসাবে কিছুটা বৃদ্ধি থাকলেও প্রান্তিক ভিত্তিতে বিদেশি বিনিয়োগের গতি মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা এই পতনের অন্যতম কারণ। গত বছরের শেষ ছয় মাসেও এফডিআই প্রবাহ কমেছিল ৭১ শতাংশ। তবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হঠাৎ বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি বেশিদিন টেকেনি, দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিনিয়োগ আবার নিম্নগামী হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তা এবং সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান বলেন, “বিনিয়োগ কমার বিষয়টি একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে স্থিতিশীলতা নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে, আর নির্বাচন হবে কিনা কিংবা কে ক্ষমতায় আসবে— সেই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা সবসময় স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করেন, কিন্তু এখন তারা অপেক্ষার নীতিতে রয়েছেন।”

বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত তিনটি পথে আসে— নতুন প্রকল্পে সরাসরি মূলধন বিনিয়োগ, মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ, এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন মূলধন বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার, যা আগের প্রান্তিকের (২৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার) তুলনায় ৬৯ দশমিক ১৮ শতাংশ কম। এছাড়া পুনর্বিনিয়োগ আয় থেকেও এসেছে মাত্র ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ১৯ কোটি ১১ লাখ ডলার থেকে ১২ শতাংশ কম। আন্তঃকোম্পানি ঋণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে— এই প্রান্তিকে এসেছে মাত্র ৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, যেখানে আগের প্রান্তিকে ছিল ৩৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু পুঁজি প্রবাহ নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যখন অনিশ্চয়তা অনুভব করেন, তখন তারা অপেক্ষা-দর্শন নীতি গ্রহণ করেন, যা অর্থনীতিকে স্থবির করে দেয়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনও বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গত আগস্টের শুরুতে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা অবনতির দিকে যায়। একাধিক শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং আমলাতান্ত্রিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক মহাপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, কিন্তু এখনো কেউ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। কারণ রাজনৈতিক সরকার না থাকায় তারা দ্বিধায় ভুগছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত মেয়াদ এবং নীতিগত স্পষ্টতার অভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সরকার বিভিন্ন বিনিয়োগ-বান্ধব পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেমন প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ ও কর ছাড়ের প্রণোদনা। তবে এই প্রচেষ্টা এখনো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। কারণ, অর্থনীতির মৌলিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বিনিয়োগ আসে না।”

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি— সরকার বিনিয়োগ পরিবেশে স্থিতিশীলতা আনতে হলে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের দুরবস্থা কাটাতে হবে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এখন বড় প্রতিবন্ধক। এছাড়া ডলারের সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণের উচ্চ সুদের হারও বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।

অর্থনীতিবিদরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সংকেত। কারণ, গত এক দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সেই অর্জনে আঘাত হানছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এখনও বিনিয়োগ পুরোপুরি থেমে যায়নি, তবে গতি কমে গেছে। এটি আশঙ্কার কারণ, কারণ বিদেশি পুঁজি প্রবাহে যে ধীরগতি এসেছে, তা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগে নতুন গতি আনতে হলে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। অন্যথায়, আগামী প্রান্তিকেও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে।

সর্বোপরি, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচকের পতন নয়, এটি দেশের সামগ্রিক আস্থার প্রতিফলন। রাজনৈতিক, নীতিগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ খাত আরও দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়তে পারে— এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত