প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সরকারি কার্যক্রম স্থগিত বা ‘গভর্নমেন্ট শাটডাউন’ এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেই নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই নাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ (Bureau of Labor Statistics) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল সংস্থা কার্যক্রম বন্ধ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থনৈতিক তথ্য—বিশেষ করে চাকরির প্রতিবেদন (U.S. Jobs Report) এবং ভোক্তা মূল্য সূচক (CPI) প্রকাশ বিলম্বিত হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা মার্কিন অর্থনীতি এবং বিশ্ববাজারে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি অচলাবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রম তত বেশি বাধাগ্রস্ত হবে। জে.পি. মরগ্যানের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ফেরোলি বলেন, “সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময় আমরা কিছুটা অন্ধভাবে চলব, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের (Federal Reserve) জন্য আগামী অক্টোবর মাসে সুদের হার কমানো এখনো যুক্তিযুক্ত।”
তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। জে ব্যারি, জে.পি. মরগ্যানের গ্লোবাল রেটস স্ট্র্যাটেজির প্রধান, বলেন, “যদি সরকার বন্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ফেডের ভবিষ্যৎ নীতিমালা নির্ধারণ এবং বাজারে সুদ হ্রাসের সম্ভাবনা নিরূপণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ডিসেম্বরের পরবর্তী সময়ে সুদ হ্রাসের প্রত্যাশাও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।”
এদিকে, সরকারি অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতায়। ফেরোলি জানান, “প্রতি সপ্তাহে সরকারের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি থেকে প্রায় ০.১ শতাংশ হ্রাস পায়। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই অবস্থা চললে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় এর যে কোনো ধাক্কা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হয়। শেয়ারবাজার, তেলের দাম, সোনার বাজারসহ আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ইতোমধ্যেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যদি ফেডারেল রিজার্ভ তথ্যের অভাবে ভুল নীতি গ্রহণ করে বা সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করে, তবে তা ডলারের মান ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ইউরোপ ও এশিয়া—বিশেষ করে চীন, জাপান, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো—মার্কিন বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমে গেলে রপ্তানিনির্ভর এসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের গতি মন্থর করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিকভাবে সংযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, বিশেষ করে রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG) খাতে। যুক্তরাষ্ট্রে যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায় বা ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পায়, তবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অর্ডারও কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলে ডলারের মান ওঠানামা করতে পারে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি অচলাবস্থা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং উদীয়মান বাজারগুলোর জন্যও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এতে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকে পড়ে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে পুঁজি প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়াতে পারে।
ঢাকার অর্থনীতিবিদ ড. মেহেদী হাসান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে সরকার বন্ধ থাকা মানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারে ব্যয়ের গতি কমে যাওয়া। এতে বাংলাদেশসহ রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো স্বল্পমেয়াদে আঘাত পেতে পারে। যদি এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তবে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বন্ধ এখন আর শুধুমাত্র ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্যে এক বড় পরীক্ষার মুহূর্ত। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য এটি এক সতর্ক সংকেত, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে পারে।










