প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বৈঠক ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আমন্ত্রণ না পাওয়া কিছু নেতার ক্ষোভ ও হট্টগোলে এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার ঘটে, যা মুহূর্তেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
রোববার বিকেল পৌনে ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বৈঠকে সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনের ১১ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই কারা আমন্ত্রিত আর কারা বাদ পড়েছেন—তা ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহকারী যখন ১১ নেতাকে আলাদাভাবে ডেকে নেন, তখন বাদ পড়া অন্যান্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ক্ষুব্ধ হয়ে হট্টগোল শুরু করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, আমন্ত্রিত নয় এমন কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপস্থিত সাংবাদিকরা ঘটনাটি ভিডিও করার চেষ্টা করলে গুলশান কার্যালয়ের কর্মচারী সাইফুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন তাদের ওপর চড়াও হন। এ সময় আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক জাহিদ হোসেনকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে ঘটনাটি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দুঃখ প্রকাশ করেন।
ক্ষুব্ধ নেতারা অভিযোগ করেন, “দুর্দিনে দলের পতাকা হাতে নিয়ে সংগ্রাম করেছি, এখন মধু গিলতে এসেছে অন্যরা।” তাদের অভিযোগ, সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী ও কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন দলীয় মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটাচ্ছেন। তারা প্রত্যেক আসনে ভাগবাটোয়ারা করে পছন্দের প্রার্থীদের ডেকেছেন, অথচ যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন বা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে।
সভা শুরুর আগে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী নাদীর আহমদ, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন, এম এ কাহার, এম এ সাত্তার; সুনামগঞ্জ-৪ আসনের আবুল মুনসুর শওকত, ব্যারিস্টার আবিদুর রহমান; এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের মাহবুবুর রহমান ও মোতালেব খানসহ প্রায় ১৫ জন নেতা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা দাবি করেন, জেলার তিন দায়িত্বশীল নেতা ইচ্ছাকৃতভাবে মনোনয়নপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছেন।
জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি নাদীর আহমদ বলেন, “সুনামগঞ্জ বিএনপির আহ্বায়ক, স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক দলের ত্যাগী নেতাদের অবজ্ঞা করেছেন। মহাসচিব আমাদের জানিয়েছেন, তিনি তালিকা সংক্ষিপ্ত করার জন্য কাউকে দায়িত্ব দেননি এবং কোথাও কাউকে একক প্রার্থী হিসেবে আমন্ত্রণ জানাননি। বরং সবাইকে মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন।”
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য আবদুল হক এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমাদের দোষারোপ করা ঠিক নয়। আমরা কেবল কেন্দ্রীয় নির্দেশনাই বাস্তবায়ন করেছি।”
বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১১ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের মধ্যে থেকে প্রতি আসনে একজনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে মনোনয়ন না পেলেও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করার সুযোগ থাকবে।” তিনি উপস্থিত নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রচারণায় কেউ কারও সমালোচনা করবেন না। দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর পক্ষে সবাই একসঙ্গে কাজ করবেন।”
এরপর তিনি প্রত্যেক প্রার্থীর বক্তব্য শোনেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন। বৈঠকের শেষে ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাদের মনে করিয়ে দেন, “আমাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা। দলকে কেন্দ্র করে বিভক্তি তৈরি করলে ত্যাগী নেতাদের ত্যাগ বৃথা যাবে।”
এই বৈঠক ও পরবর্তী হট্টগোল সুনামগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে ত্যাগী নেতারা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন, অন্যদিকে জেলা ও বিভাগের দায়িত্বশীলরা বলছেন, এটি কেবল ভুল বোঝাবুঝি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এমন ভেতরের টানাপোড়েন বিএনপির ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্যও চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।