প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দেশের রপ্তানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বা বারো হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সোমবার রপ্তানি ও শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “এই অগ্নিকাণ্ড শুধু ব্যবসায়ী নয়, সরকারের জন্যও বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে এবং বাজার হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, আগুনের পরিপূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করে দ্রুত পুনর্গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের হৃৎপিণ্ড, এবং এখানে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও যেন না ঘটে, সে বিষয়েও জোর দিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইএবি নেতারা বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং জোন দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন কোটি কোটি ডলারের পণ্য ওঠানামা করে। এমন একটি সংবেদনশীল স্থানে আগুন নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতিফলন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অটোমেটিক ফায়ার ডিটেকশন ও প্রোটেকশন ব্যবস্থা কি ছিল? আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং টিম কোথায় ছিল? বাইরে থেকে ফায়ার সার্ভিস আসতে এত সময় কেন লেগেছে?
ইএবি নেতাদের অভিযোগ, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ (সিএএবি), কাস্টমস হাউস এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স—এই তিন পক্ষই কার্গো টার্মিনালের দেখভাল ও তত্ত্বাবধানে থাকা সত্ত্বেও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আগুনে পোশাক, চামড়া, হিমায়িত মাছ, কৃষিপণ্য, ফলমূল, ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামালসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য পুড়ে গেছে। অনেক ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করেছেন এবং বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইএবি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ক্ষতিগ্রস্তদের বিমা দাবির দ্রুত নিষ্পত্তি, যেসব পণ্যে বীমা কাভার ছিল না সেগুলোর জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল থেকে সহায়তা, বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তা জোরদার, রপ্তানি পণ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা, আধুনিক স্ক্যানার ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন, কার্গো ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশন ও ফায়ার প্রোটেকশন ব্যবস্থার উন্নয়ন।
রপ্তানিকারক সংগঠনগুলো সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, কাস্টম এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করতে। তারা আশা করেছেন, তদন্তের মাধ্যমে যেসব নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা ঘাটতি আছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে।
এই অগ্নিকাণ্ড শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং দেশের রপ্তানি খাতের জন্য নিরাপত্তা এবং ব্যবস্থাপনার গুরুতর সংকটকেও প্রকাশ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আস্থা বজায় রাখতে হলে বিমানবন্দরসহ সমস্ত রপ্তানি অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নিরাপত্তা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
রপ্তানিকারকরা আশাবাদী, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ও অবকাঠামো পুনর্গঠন করা হয়, তবে দেশের রপ্তানি খাত দ্রুত পুনরুদ্ধারযোগ্য। তবে তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ক্ষতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।