আমিরাত উদ্বোধন করল নিজস্ব বিদ্যুৎচালিত কার্গো বিমান ‘হেলি’

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭১ বার
আমিরাত উদ্বোধন করল নিজস্ব বিদ্যুৎচালিত কার্গো বিমান ‘হেলি’

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) আবারও প্রযুক্তির জগতে নিজের শক্তি প্রদর্শন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে, আমিরাত নিজেদের তৈরি প্রথম হাইব্রিড কার্গো বিমান ‘হেলি’ উদ্বোধন করেছে। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আবুধাবিতে এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদ বিন মোহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনি নিজে বিমানটি উন্মোচন করেন এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতিকে দেশের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।

হেলি নামের এই বিমানকে ‘হাইব্রিড’ বলা হচ্ছে কারণ এটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত। এটি লুদ অটোনোমাস নামের একটি আমিরাতভিত্তিক কোম্পানির তৈরি। বিমানের উদ্দেশ্য মূলত কার্গো পরিবহন, বিশেষত এমন এলাকাগুলিতে যেখানকার দুর্গমতা এবং বিমান অবতরণ-উড্ডয়ন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা মাতার আল মান্নাই জানান, হেলি একটানা ৭০০ কিলোমিটার পথ উড়তে সক্ষম, সর্বোচ্চ ২৫০ কেজি মালপত্র বহন করতে পারে এবং এটি স্বল্প অবকাঠামোযুক্ত অঞ্চলেও পৌঁছাতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি বৈদ্যুতিক বিমান তৈরি করা যা দীর্ঘপথ উড়তে সক্ষম হবে। কারণ, বৈদ্যুতিক যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারির চার্জ সীমিত সময়ের জন্য থাকে। একবার যাত্রাপথে চার্জ শেষ হয়ে গেলে তা পুনরায় চার্জ করার সুযোগ সবসময় থাকে না। এই সমস্যার সমাধান করতে আমরা হেলির প্রপেলার বিশেষভাবে ডিজাইন করেছি এবং এতে একটি জেনারেটরও সংযুক্ত করা হয়েছে। ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলেও জেনারেটর সক্রিয় হয়ে বিমানকে স্বাভাবিকভাবে চালনা করবে। ফলে দীর্ঘপথ উড়ানো সম্ভবপর হয়েছে।”

হেলির বিশেষত্ব কেবল দীর্ঘপথে উড়তে সক্ষম হওয়াই নয়। মাতার আল মান্নাই বলেন, “হেলির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে এটি ছোট ও সংকীর্ণ হেলিপ্যাডে অবতরণ করতে পারে। অর্থাৎ যেখানে প্রচলিত জ্বালানি তেলচালিত কার্গো বিমান অবতরণ করতে পারে না, সেখানে হেলি পৌঁছাতে পারবে। এটি দুর্গম এলাকার মানুষ ও ব্যবসায়িক পরিবেশে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।”

এই উদ্বোধনের মাধ্যমে আমিরাতের উদ্ভাবন কেবল দেশীয় অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক পরিবহন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমান বিশ্বের যে দিকে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, সেই প্রেক্ষাপটে হেলি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

হেলির ব্যবহারিক সক্ষমতা, অর্থাৎ কার্গো পরিবহনে দীর্ঘ পথ ও সীমিত অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে মালপত্র পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা, বিশেষ করে মানবিক সাহায্য, দূর্গম এলাকা ও জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দূর্গম এলাকায় তাত্ক্ষণিক মেডিকেল সরবরাহ বা জরুরি সামগ্রী পাঠানোর ক্ষেত্রে হেলির কার্যকারিতা নজরকাড়া হতে পারে।

মাতার আল মান্নাই আরও বলেন, “আমরা বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিবেশ বান্ধব ও কার্যকরী কার্গো পরিবহনের দিকেই তাকাচ্ছি। বৈদ্যুতিক বিমান শুধু পরিবেশের জন্য নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে আরও কৌশলগত এবং দূর্গম এলাকায় মালপত্র পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বহুমুখী সুবিধা প্রদান করে। হেলি সেই চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি করা হয়েছে।”

উদ্বোধনের সময় উপস্থিত বিশেষ অতিথিরা মন্তব্য করেন, হেলির যাত্রা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং আমিরাতের স্বাধীন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দৃষ্টিকোণকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। তারা বলেন, “হেলি আমিরাতের অভ্যন্তরীণ উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিফলিত করছে। এটি শুধু দেশীয় নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতেও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”

এদিকে, প্রযুক্তিবিদ ও বিমান বিশেষজ্ঞরা হেলির কার্যকারিতা ও পরিবেশবান্ধব উপাদান নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশংসা করছেন। তারা বলছেন, বৈদ্যুতিক বিমান ভবিষ্যতের বিমান পরিবহন ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিমানগুলোর তুলনায় এটি কম খরচে, কম দূষণ সৃষ্টিকারী এবং দ্রুত কার্যকরী।

বিমানটিকে উদ্বোধনের সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হেলির কার্যকারিতা, ডিজাইন এবং পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রদান করেছেন। বিশেষ করে, বৈদ্যুতিক বিমান হওয়ায় এটি কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হেলি শুধু আমিরাতের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতীক নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক বিমান বাজারে নতুন ধারা সৃষ্টি করবে। বৈদ্যুতিক কার্গো বিমান তৈরির ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রযুক্তি ও পরিবহন ক্ষেত্রে নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের শেষে শেখ জায়েদ বিন মোহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বলেন, “আমিরাতের জন্য এটি একটি গর্বের মুহূর্ত। দেশীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমরা পরিবেশ বান্ধব, আধুনিক ও কার্যকরী প্রযুক্তির পথ প্রশস্ত করেছি। এটি আমাদের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার প্রতিফলন।”

হেলির যাত্রা এই মুহূর্তে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর সম্ভাবনা, পরিবেশবান্ধব কার্যকারিতা এবং কার্গো পরিবহনের খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার ক্ষমতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, আগামী দিনে বৈদ্যুতিক বিমানগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং এটি বিশ্বব্যাপী পরিবহন খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উদ্ভাবিত হবে।

সংক্ষেপে, হেলি শুধু একটি বিমান নয়; এটি প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা এবং বৈশ্বিক উদ্ভাবনের এক নতুন অধ্যায়। আমিরাতের এই পদক্ষেপ দেশের উদ্ভাবনী শক্তি, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতের বিমান পরিবহনের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com