মনুষ্যত্বের ক্ষয়: এক কুলির মজুরি থেকে এতিমখানার হামলা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮১ বার
মনুষ্যত্বের ক্ষয়: এক কুলির মজুরি থেকে এতিমখানার হামলা

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সেরা ক্ষমতা দিয়েছেন—স্মৃতি, যুক্তি, ন্যায়বোধ, করুণা ও সৌন্দর্য। পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব এমন এক দায়িত্বের সঙ্গে সংযুক্ত, যা একদিকে ন্যায় ও দয়া আর অন্যদিকে সহমর্মিতা ও সৌন্দর্যের শিক্ষা দেয়। কিন্তু আজকের সময়ের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মানুষ সেই দায়িত্ব ভুলে অতীতের কুখ্যাত জাহেলি যুগের মতোই নির্দয়, অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্তদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের সেই অন্ধকার দিক যেন ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে।

ইতিহাসের আয়নায় দেখা যায়, একসময় জাহেলি যুগের বেদুইনরা শক্তির অহংকারে উন্মত্ত ছিল। তাদের হৃদয় মরুভূমির মতো শুষ্ক। দুর্বল ভ্রমণকারী বা ব্যবসায়ীর মাল লুট করা তাদের কাছে গর্বের প্রতীক ছিল। সেই সময়ে অসহায় মানুষের কান্না ছিল বিনোদনের উপকরণ। কোরআনে এ সময়ের মানবতাহীন আচরণকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “তোমরা এমন অবস্থায় ছিলে যে একে অপরকে হত্যা করতে এবং তোমাদের গোষ্ঠী থেকে দুর্বলদের তাড়িয়ে দিতে।” (সুরা আল-বাকারা : ৮৫)

মানুষকে এই অমানবিকতার আঁধার থেকে উদ্ধার করতে, আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সা.)কে পাঠিয়েছিলেন। নবীজি শিক্ষা দিয়েছেন, দয়া ও সহমর্মিতা মানবজাতির প্রাণস্পন্দন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” (বুখারি : ৬০১৩) এবং “যে মানুষের প্রতি রহম করে না, আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না।” (মুসলিম: ২৩১৯)

কিন্তু আজকের পৃথিবী যেন সেই পুরোনো জাহেলিয়ার চিত্র পুনরাবৃত্তি করছে। সভ্য পোশাকে আবৃত মানুষের অন্তরে মরুভূমির নিঠুর শুষ্কতা বজায় রয়েছে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও সমাজকে লজ্জিত করেছে। সেখানে দেখা যায়, শীর্ণকায় এক কুলি ট্রেনের সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন নিজের প্রাপ্য মজুরি ফেরত পাওয়ার আশায়। ঘামে ভেজা শরীর, হাঁপ ধরা বুক, তবু চোখে অনড় দৃঢ়তা। তার মজুরি প্রদান করা হয়নি। ট্রেনের গতি তাকে শেষমেষ পরাস্ত করলেও তার কণ্ঠে ছিল কেবল এক দীর্ঘশ্বাস, ক্ষোভ নয়। আহাজারি করে তিনি বললেন, “আল্লাহ, আপনার কঠিন বিচার করবেন।”

এই দৃশ্য শুধু এক কুলির নয়, বরং আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই, অথচ তাদের পরিশ্রমের পেছনে দাঁড়ানো উচিত ছিল। এমন দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতার ভিত্তি—ন্যায়, করুণা ও সহমর্মিতা—কীভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

মনুষ্যত্বের এই পতন শুধু শ্রমিক বা কুলির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি শোনা গেছে, একটি এতিমখানায় ডাকাতি করা হয়েছে। যাদের দায়িত্ব ছিল শিশুদের সুরক্ষা করা, তারা সেখানে নিজের লোভ পূরণের জন্য হাজির। এতিম, বিধবা ও দরিদ্রদের পাশে না দাঁড়িয়ে, কিছু মানুষ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অমানবিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে।

শরীয়তপুরের নরিয়া উপজেলার মুতালেব নামের এক দরিদ্র মানুষও এই বাস্তবের উদাহরণ। তার জীবনের একমাত্র উপার্জন ছিল একটি গাড়ি। গত ৭ নভেম্বর দুর্বৃত্তরা সেই গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কালো ধোঁয়ার মধ্যে পুড়ে যায় তার স্বপ্ন, যা কেবল নিজের নয়—পরিবারেরও। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আজ সেই পরিবার দাঁড়িয়ে আছে ছাইয়ের পাশে, হাত তুলে আসমানের দিকে তাকিয়ে বলছে, “হে আল্লাহ, কোথায় সেই মানুষগুলো, যারা একদিন ‘মানবতা’র নামে গর্ব করত?”

মানুষের এই আচরণ শুধু একক নয়; এটি একটি সামাজিক সংকেত। নৈতিক মূল্যবোধ, দয়া ও সহমর্মিতা হারিয়ে গেলে সমাজের দুর্বলরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী মানুষ—তাদের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ভরা। যারা তাদের অধিকার আদায়ে লড়ছে, তারা আজও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এ ধরনের ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মানবতা শুধুমাত্র একটি নৈতিক ধারণা নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় দায়িত্ব, যা প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয়। যে ব্যক্তি সমাজের দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সে সত্যিকারের মানুষ। অন্যথায় সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নৃশংসতা প্রতিদিনই আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

অতীতের নৈতিক পাঠ আমাদের শেখায় যে, যে সমাজে দয়া, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ অগ্রাহ্য করা হয়, সেই সমাজে ক্রমেই অন্ধকার বৃদ্ধি পায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক কুলির মজুরি বঞ্চিত হওয়া বা এতিমখানায় হামলা হওয়া কেবল isolated ঘটনা নয়; এটি আমাদের সকলের জন্য সতর্কবার্তা।

মানুষের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে অন্যের ক্ষতি না করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ওপর। সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি এই মূলনীতি অনুপ্রাণিত হয়, তবেই আমরা অন্ধকারের থেকে মুক্তি পাব। না হলে সভ্যতার আড়ালে লুকানো সেই নিঠুর শুষ্কতা ক্রমশই মানুষের মন ও হৃদয় দখল করবে।

মানবতার এই ক্ষয় রোধ করার একমাত্র উপায় হলো সামাজিক দায়িত্ববোধ, নৈতিক শিক্ষা, এবং প্রতিটি মানুষের ন্যায়ের পক্ষে স্থির প্রতিশ্রুতি। একক ঘটনার নীরব প্রত্যক্ষ দর্শক থেকে শুরু করে প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিক—সবাইকে এই মূল্যবোধের জন্য সচেতন হতে হবে। কেবল দয়া ও ন্যায়ের চর্চাই আমাদের সমাজকে সেই আলোর দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা অন্ধকার জাহেলিয়ার তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে থাকবে।

আজকের এই কুলির দৌড়, এতিমখানার দুর্দশা এবং পরিবারের আহাজারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা শুধু নৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আমাদের সকলের জন্য জীবনের অন্যতম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন ছাড়া সভ্যতা ও সমাজের উন্নয়ন কল্পনা করাও অসম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com