ঢাকায় আবার ভূমিকম্প, নরসিংদীতে কম্পনের উৎস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
ইন্দোনেশিয়ায় ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প, আতঙ্কে স্থানীয়রা

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

রাজধানী ঢাকা আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে অনুভূত হওয়া কম্পনটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির নিশ্চিত করেছেন, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬ এবং এটি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প বলে গণ্য হলেও এর উৎস যে স্থান—তা সম্প্রতি ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি জানান, আজকের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর ঘোড়াশাল এলাকা।

মৃদু মাত্রার হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন দুলে ওঠার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন অনেকেই। বাসা-বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় কিছু সময়ের জন্য ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। কেউ কেউ আতঙ্কে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন, আবার অনেকেই জানালা বা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে স্থির হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। ভূমিকম্পটি অনুভূত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট পোস্ট, লাইভ ও বার্তা।

এর মাত্র ছয় দিন আগেই—গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর)—ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। সেই কম্পনের উৎসও ছিল নরসিংদী, তবে উৎপত্তিস্থল ছিল মাধবদী এলাকা এবং গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার, যা বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক গভীরতা হিসেবে বিবেচিত। শুক্রবারের সেই বড় ধরনের ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত এবং ছয়শ’র বেশি মানুষ আহত হন। বিভিন্ন জায়গায় ভবনের অংশ ধসে পড়েছিল, দেয়ালে ফাটল দেখা দেয় এবং বহু পরিবারের ঘরবাড়িতে ক্ষতি হয়।

এর পরদিন শনিবার আবারও দুই দফা কম্পন অনুভূত হয়। অর্থাৎ মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারটি ভূমিকম্পে দুলে ওঠে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদীসহ আশপাশের বড় অংশ। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা এটিকে সাধারণ কম্পন নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, একই উৎসস্থলে কয়েকবার সক্রিয়তা দেখা দিলে তা ভূগর্ভস্থ প্লেটের চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আজকের ভূমিকম্পটি মাত্রায় ছোট হলেও এর ঘনঘন ঘটনা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ দেশগুলোর মধ্যে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। ঢাকা—জনসংখ্যায় ঘনবসতিপূর্ণ, দুর্বল কাঠামোর অসংখ্য ভবন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে—বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকা যে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সৌভাগ্যের ফল, কিন্তু একই উৎসে আবারো বড় কম্পন হলে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

নরসিংদী অঞ্চলে সক্রিয় ফল্টলাইনের বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভূ-তত্ত্ববিদরা মনে করেন, বাংলাদেশে তেমন বড় প্লেট ভূমিকম্প না ঘটলেও মধ্যম ও ক্ষুদ্র মাত্রার ভূমিকম্প ঘন ঘন হওয়া বড় একটি ভূমিকম্পের পূর্বাভাসও হতে পারে। তাদের মতে, উৎপত্তিস্থল যদি বারবার একই অঞ্চলে থাকে, তাহলে সেখানে ভূগর্ভে চাপ জমা হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ায়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আজকের কম্পনের পর মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা, গুলশান, মালিবাগ, মগবাজার—এ সব এলাকাতেই কম্পন অনুভূত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনে বসবাসকারী মানুষরা আতঙ্কে দ্রুত নীচে নেমে আসেন। ফলে ভবনভর্তি মানুষের হুড়োহুড়ি কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অনেকে শিশু ও প্রবীণদের বাঁচাতে ছুটোছুটি করেন। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে বহু মানুষ ঘরবাড়ির ফাটল নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন; আজকের কম্পনে তাদের সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার ঝড় বইছে। কেউ কেউ বলেন, “ঢাকা কি নিরাপদ?”—আবার কেউ লিখেছেন, “গত সপ্তাহেই চারটা ভূমিকম্প হলো, আজ আবার!” বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, জনসচেতনতা না বাড়লে এবং ভবন নির্মাণে অনিয়ম ঠেকানো না গেলে ভবিষ্যত হতে পারে আরও ভয়াবহ।

ভূমিকম্পের পর পরই বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয় ভবন–ঝুঁকি, জরুরি প্রস্তুতি ও সিভিল ডিফেন্সের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন ভবনের ফাটল শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে অতীতে বহুবার এমন প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আজকের কম্পন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—ঢাকা বড় ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়।

নাগরিকদের মনে নতুন শঙ্কা তৈরি করে আজকের কম্পনটি। বিশেষ করে শুক্রবারের বড় ভূমিকম্পে যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের মনে আতঙ্ক ফিরে এসেছে। অনেকেই বলেছেন, পুনরায় শক্ত কম্পন হলে তারা আর এই ভবনে থাকতে পারবেন না। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার গ্রামে চলে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।

দেশের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ক্ষুদ্র কম্পন আরও হতে পারে। কারণ প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশ একাধিক সক্রিয় ফল্টলাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভারতীয় প্লেট এবং মিয়ানমার প্লেটের সংঘর্ষ এলাকাটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থির করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে; পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ভবন থেকে কীভাবে বের হতে হবে, ঘরের কোন জায়গায় আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ—এসব তথ্য জানা জরুরি।

মানুষের জীবন, জীবিকা এবং নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এই ভূমিকম্পের প্রবণতা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি নেওয়ার বিকল্প নেই। রাজধানীর পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা, ভবন নির্মাণে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ, জরুরি সাড়া–প্রদানের সক্ষমতা বাড়ানো—সবই এখন বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

আজকের ভূমিকম্পে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের কম্পন একটাই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করেছে—ঢাকা এমন এক নগরী, যেখানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভূকম্পন লাখো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তাই এই কম্পনকে শুধু স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com