প্রকাশ: ০৯ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব প্রতিবেদক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্ধকার দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠছে গত বছরের ৫ আগস্ট। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা সম্প্রতি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, ওই দিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৮ জন। এই তথ্য উঠে এসেছে এক নিহত বিক্ষোভকারীর মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। বিবিসির দাবি অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডে ‘প্রাণঘাতী শক্তি’ প্রয়োগের সরাসরি অনুমতি দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা।
প্রতিবেদনের ভিত্তি এক মোবাইল ভিডিও
বিবিসির অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিরাজ হোসেন নামের এক বিক্ষোভকারীর মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, যিনি ওই দিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। তাঁর পরিবারের কাছ থেকে মোবাইলটি উদ্ধার করে ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি। ভিডিও অনুযায়ী, দুপুর ২টা ৪৩ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থানার ফটকের সামনে থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর একটি দল বিক্ষোভকারীদের সামনে থেকে সরে যাওয়ার পরই পুলিশ আকস্মিকভাবে গুলি চালাতে শুরু করে।
সিসিটিভি ও ড্রোন ভিডিওতে গণহত্যার চিত্র
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, থানার উল্টোপাশে একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা গুলির মুখে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছেন। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আহতদের ওপর লাথি মারছে পুলিশ। বিবিসির হাতে থাকা ড্রোন ফুটেজে মহাসড়কে পড়ে থাকা একাধিক মৃতদেহ এবং ভ্যান-রিকশায় করে আহতদের সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য উঠে এসেছে। তারা দাবি করছে, পুরো ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে চলা গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান অন্তত ৫৮ জন।
৪ আগস্টের ভিডিওতেও গুলির প্রস্তুতি
বিবিসি জানায়, ৪ আগস্টের রাতের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুলিশের সদস্যরা আগে থেকেই সড়কে গুলি চালানোর জন্য থানা থেকে বের হচ্ছিলেন। মেশিনগান থেকে গুলির শব্দ, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া মহাসড়ক এবং আতঙ্কিত জনতার ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে ভিডিওগুলো এক ভয়াবহ গণহত্যার আলামত বহন করে।
অডিও ফুটেজে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা?
আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসে একটি অডিও রেকর্ডিং থেকে। যেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, একজন অজ্ঞাত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের সময়, গুলি চালাতে নির্দেশ দিতে শোনা যায়। বিবিসি দাবি করেছে, অডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে যুক্তরাজ্যের অলাভজনক অডিও ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ারশট’। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এতে কোনো সম্পাদনার প্রমাণ নেই এবং এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও অডিওতে থাকা কণ্ঠের সঙ্গে শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বরের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছে।
আইনি প্রতিক্রিয়া ও দায় নির্ধারণ
এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসানসহ একাধিক পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বিবিসি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হাসপাতালের নথিপত্র, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও পোস্ট যাচাই করে বিবিসি এই রিপোর্ট তৈরি করেছে, যেখানে উঠে এসেছে—একটি রাজনৈতিক সংকট কীভাবে রূপ নেয় মানবিক বিপর্যয়ে।
এই অনুসন্ধান সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর রাষ্ট্রীয় শক্তির এমন ব্যবহার ভবিষ্যতে কতটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এখন অপেক্ষা—সরকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না। তবে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রতিবেদন ঘিরে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর ৫ আগস্ট হয়তো ইতিহাসের এক নতুন কালো অধ্যায় হয়ে উঠছে—যার জবাবদিহি সময়ই ঠিক করে দেবে।