এলপিজি সংকটে বাজার অচল, ফিলিং স্টেশনে ঝুলছে ‘গ্যাস নেই’

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০৯ বার
এলপিজি সংকটে বাজার অচল, ফিলিং স্টেশনে ঝুলছে ‘গ্যাস নেই’

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এখন যেন এক অচেনা দৃশ্য নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। ফিলিং স্টেশন ও এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির দোকানে দোকানে ঝুলছে একই লেখা—‘গ্যাস নেই’। কোথাও আবার দোকান খোলা থাকলেও ভেতরে নেই কোনো সিলিন্ডার, নেই রিফিলের নিশ্চয়তা। রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে অটোগ্যাসনির্ভর যানবাহন—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র সংকট। চাহিদার অর্ধেকও এলপিজি বাজারে না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে পরিবহন খাতের মানুষজন।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বহু এলপিজি দোকানে তালা ঝুলছে অথবা নোটিশ বোর্ডে বড় করে লেখা ‘এলপি গ্যাস নেই’। যেসব দোকান খোলা আছে, সেখানেও ক্রেতাদের দীর্ঘ অপেক্ষার পর শোনা যাচ্ছে একই কথা—আজ গ্যাস আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে দোকানদাররা বলছেন, সিলিন্ডার আছে ঠিকই, কিন্তু সব বোতল খালি। ফলে বাধ্য হয়েই ‘গ্যাস নেই’ বোর্ড টানাতে হচ্ছে।

এই সংকটের মধ্যেই বাজারে শুরু হয়েছে লাগামহীন দাম নৈরাজ্য। সরকারি নির্ধারিত দামে যেখানে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকার আশপাশে থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে অনেক জায়গায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। তাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না সব দোকানে। ভোক্তাদের অভিযোগ, এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেও গ্যাস মিলছে না। কেউ কেউ ফোন করে অর্ডার দেওয়ার চেষ্টা করলেও সাড়া মিলছে না। প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়ে যারা বেশি দামে কিনছেন, তারাও নিশ্চিত নন—পরের মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে কি না।

এলপিজির এই তীব্র সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বাসাবাড়ির রান্নাবান্নায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা বা হটপ্লেট ব্যবহার করছেন, যা বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন কাঠ বা অন্যান্য জ্বালানির দিকে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নগর জীবনে যেখানে এলপিজি হয়ে উঠেছিল স্বাভাবিক ও নিরাপদ জ্বালানি, সেখানে হঠাৎ এই সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অস্থির করে তুলেছে।

সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে অটোগ্যাসনির্ভর পরিবহন খাতে। রাজধানীর বিভিন্ন অটোগ্যাস স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও স্টেশন বন্ধ, কোথাও আবার দীর্ঘ যানজট। শত শত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু গ্যাস মিলছে না। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও গ্যাস পাননি। কেউ কেউ হতাশ হয়ে গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখছেন। অটোগ্যাস ব্যবহারকারীরা জানান, দাম বাড়ার পর থেকেই এই সংকট প্রকট হয়েছে। কোনো স্টেশনে গেলে বলা হচ্ছে গ্যাস শেষ, আবার কোথাও লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে—আজ আর সরবরাহ নেই।

ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাসিক এলপিজির চাহিদা এক লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে। অথচ বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশের মতো। দেশে মোট সাড়ে ৫ কোটি এলপিজি সিলিন্ডার থাকলেও মাসে রিফিল হচ্ছে মাত্র সোয়া কোটি। যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন। এই ঘাটতির ফলেই বাজারে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ চাপ এবং সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে জাহাজ সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে আমদানিতে ধাক্কা লেগেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা। একাধিক এলপিজি কোম্পানি সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় উৎপাদন ও আমদানি কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। আবার কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি সময়মতো না পাওয়ায় জাহাজ খালি ফিরে গেছে অথবা দেরিতে পণ্য এসেছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, দেশে মোট ২৮টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত এলপিজি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত আমদানি করতে সক্ষম ছিল সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান। বাকি ২০টির বেশি কোম্পানি বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় আমদানি করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে একটি চাপ তৈরি হচ্ছিল। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এলসি খোলার ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতা করে, তাহলে সব কোম্পানি আমদানিতে নামতে পারবে এবং তখন এলপিজিতে উদ্বৃত্তও তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের আশা, এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর হলে আগামী সপ্তাহ থেকেই ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে এই আশার চেয়ে বেশি রয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ এর আগেও সংকট কাটার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সুফল পাওয়া যায়নি।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট শুধু সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়, বরং বাজার তদারকির দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। সরকারি নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংকটের সুযোগ নিয়ে একটি শ্রেণি অতিরিক্ত মুনাফা করছে, আর ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি এখন দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। আমদানি নির্ভরতা কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং শক্তিশালী নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও গ্রাহকদের একই ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

সব মিলিয়ে ফিলিং স্টেশন ও দোকানে ঝুলে থাকা ‘গ্যাস নেই’ লেখা শুধু একটি নোটিশ নয়, এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে—কবে এই সংকট কাটবে, কবে স্বাভাবিক দামে মিলবে রান্নার গ্যাস, আর কবে অটোগ্যাস স্টেশনে ফিরে আসবে স্বস্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com