এখনো পানিবন্দী ফুলগাজী, বন্যায় কৃষি-প্রাণিসম্পদের ক্ষতি ভয়াবহ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ফেনীর সীমান্তঘেঁষা উপজেলা পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া থেকে বন্যার পানি অনেকটা নামলেও ফুলগাজীর মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। এখনো উপজেলার একাংশ পানির নিচে, বাঁধ ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢোকার প্রক্রিয়া পুরোপুরি থামেনি। নদীর বাঁধের ভাঙা স্থানের পাশের বসতভিটা আর মাঠ-ঘাটে এখনো পানি জমে আছে, ফলে ঘরবাড়ি সংস্কার আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়ে উঠছে কঠিন।

গত ৮ জুলাই থেকে প্রবল বৃষ্টি আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া আর সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের অন্তত ৩৬টি স্থান ভেঙে যায়। এরপরই ফুলগাজী, পরশুরামসহ জেলার পাঁচটি উপজেলার দুইটি পুরোপুরি আর তিনটি আংশিকভাবে প্লাবিত হয়। এ বন্যা কেড়ে নিয়েছে মানুষের স্বস্তি, বাড়িয়েছে কৃষি ও প্রাণিসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি।

ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়ন ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ঘরবাড়ি এখনো পানির নিচে। কোথাও কোথাও মানুষেরা ঘর তালাবন্দি করে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। কেউ কেউ উঁচু ভবনের বারান্দায় গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন। এমন অবস্থায় স্থানীয়রা নিজেরা চাঁদা তুলে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটে মাটি আর সুরকি ফেলে অস্থায়ী সংস্কারের চেষ্টা করছেন। মুন্সিরহাট থেকে কামাল্লার দিকে যাওয়া সড়কটি পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। স্বেচ্ছাসেবকের দল স্থানীয় মানুষের সহায়তায় দিনরাত মেরামতের কাজ করছে।

পানি না নামায় ফুলগাজীর দৌলতপুরের হাসিনা আক্তার পরিবার নিয়ে পাশের একটি ভবনের দোতলায় আশ্রয় নিয়েছেন তিন দিন ধরে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা তাঁদের খবর নিতে আসেননি। কালীরহাটের বৃদ্ধ আবদুল করিমও একই রকম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গতবারের চেয়েও এবার পানি বেশি ঢুকেছে, অথচ ত্রাণ বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ এখনো অনেকটা সীমিত।

পরশুরামে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ছবি ও তথ্যসহ ইউএনও অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে, যাতে দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়। বাঁধের পাশের গ্রামগুলোতে জরুরি ত্রাণ তৎপরতা চলমান আছে।

জেলার প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩৩০টি পুকুর, হ্যাচারি ও খামার বন্যায় তলিয়ে গেছে, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকার বেশি। প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, বন্যায় তিন উপজেলায় মারা গেছে তিনটি ছাগল, একটি ভেড়া, ২৩৫টি হাঁস ও ১০ হাজার ৬০০ মুরগি, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩০ লাখ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ক্ষতি হয়েছে আমন বীজতলা আর বর্ষাকালীন সবজির ক্ষেতে। তবে সড়ক-মাঠ-ঘাটের ক্ষতি এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা যায়নি।

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইসমাইল হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছে। ফুলগাজীর কিছু এলাকা ছাড়া অন্যত্র পানি দ্রুত নেমে গেছে, তবে কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামতের কাজ শুরু হবে। জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নতুন করে আর কোনো গ্রাম প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা নেই। তবে পুরো জেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তায় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

বন্যার পানি নামতে থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষত এখনো স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিদিন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ বছরের এই আকস্মিক বন্যা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত