রেকর্ড মজুতের মধ্যেই চাল আমদানি, দুশ্চিন্তায় কৃষক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
রেকর্ড মজুতের মধ্যেই চাল আমদানি, দুশ্চিন্তায় কৃষক

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের খাদ্য উৎপাদন ও মজুত পরিস্থিতি যখন ইতিহাসের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে, ঠিক তখনই বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আমন, বোরো ও আউশ—তিন মৌসুমেই বাম্পার ফলনের পর সরকারি গুদামে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। বাজারে নতুন আমন চালের সরবরাহও পর্যাপ্ত। এমন বাস্তবতায় সরকার সরু চালের দাম নিয়ন্ত্রণের যুক্তি দেখিয়ে আমদানির অনুমতি দেওয়ায় কৃষক, মিল মালিক ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমন ধানের দামে এবং সদ্য শুরু হওয়া বোরো মৌসুমের আবাদেও।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে গত ১৮ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিভাবে ভারত থেকে দুই লাখ টন সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শর্ত অনুযায়ী, আমদানিকৃত চালে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে এবং অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কারও নামে এই চাল পুনরায় প্যাকেটজাত করা যাবে না। আমদানিকারকদের আগামী ১০ মার্চের মধ্যে চাল এনে বাজারে ছাড়তে হবে। এরই মধ্যে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দুই দিনে ভারত থেকে ৩৬টি ট্রাকে এক হাজার ৪৪৭ টন চাল দেশে ঢুকেছে।

ভরা আমন মৌসুমে, যখন দেশের প্রায় সব বড় মোকাম ও চালকল এলাকায় নতুন চাল নামছে, তখন এমন আমদানিকে সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকদের ভাষায়, ঠিক এই সময়টায় বাজারে অতিরিক্ত চাল ঢুকলে মিলগেটে ধানের দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার সরাসরি ধাক্কা যায় উৎপাদন খরচে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে চার কোটি ১৯ লাখ টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে দুই কোটি ২৬ লাখ টন, আমনে এক কোটি ৬৫ লাখ টন এবং আউশে ২৮ লাখ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। গড়ে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১১ টন হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। অবশিষ্ট জমিতেও একই হারে ফলন হলে আমনের মোট উৎপাদন দুই কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি মজুতের চিত্রও অভাবনীয়। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি গুদামে প্রায় ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চালই রয়েছে প্রায় ১৯ লাখ টন এবং গম রয়েছে দুই লাখ টনের কিছু বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার পরও এই মজুতের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এই পরিমাণ সরকারি চাল মজুত নজিরবিহীন। তার ওপর চলতি আমন মৌসুমে সরকার রেকর্ড পরিমাণ চাল সংগ্রহ করেছে। যেখানে সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হয়, সেখানে এবার তা প্রায় ১০ লাখ টনে পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় আমদানির সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে করছেন অনেকেই।

খাদ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরু চালের দাম কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে। মূলত জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির মতো সরু জাতের চালের দামই ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জিরাশাইল চালের দাম পাইকারিতে দেড় শতাংশ বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে তা প্রায় আট শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। শম্পা কাটারির ক্ষেত্রেও খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি।

তবে চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দুটি সরু জাতের ধানের উৎপাদন হয় মূলত বোরো মৌসুমে। বর্তমানে বোরো চালের সরবরাহ না থাকায় বাজারে সরু চালের পরিমাণ কম, ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রভাব মাঝারি বা মোটা চালের ওপর পড়েনি। বরং নতুন আমনের চাল বাজারে আসায় অনেক এলাকায় মোটা চালের দাম কমতির দিকে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির দাম মিলগেটে সর্বোচ্চ দুই টাকার মতো বেড়েছে। অন্য কোনো চালের দাম বাড়েনি। নতুন চাল আসায় অনেক জায়গায় দাম বরং কমছে। তার মতে, সীমিত কয়েকটি সরু জাতের দামের কারণে আমদানির সিদ্ধান্ত পুরো বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।

দুটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের মতে, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সরু চালের সীমিত সরবরাহকে বড় করে দেখিয়ে আমদানির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করা যায়। অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের ভেতরের একটি অংশও এই উদ্যোগে নীরব সমর্থন দিচ্ছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, অতীতেও বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত চালের একটি অংশ সরকারকে বিক্রি করে মিলাররা প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেছেন। এবারও একই ধরনের পথ অনুসরণ করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, সাধারণত মজুত, স্থানীয় উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সরকারের মজুত ভালো, স্থানীয় উৎপাদনও ভালো এবং বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। এই অবস্থায় আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে কোনো একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরবরাহ ভালো থাকার পরও আমদানি হলে কৃষকের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে এবং বোরো মৌসুমে ধানের দাম কমে যেতে পারে, যা কৃষকদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে।

মিল মালিক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরাও একই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, এখন যদি বাজারে আমদানিকৃত চাল ঢুকে পড়ে, তাহলে মিলগেটে ধানের দাম কমে যাবে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। এতে কৃষকের আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের দায়িত্ব। খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরু চালের উৎপাদন হয় মূলত বোরো মৌসুমে এবং বোরোর চাল বাজারে আসতে এখনো সময় আছে। সে কারণে সাময়িকভাবে সরু চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, মাত্র দুটি সরু জাতের চালের দামের কারণে পুরো বাজারের জন্য আমদানির দরজা খুলে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। বরং বাজার মনিটরিং জোরদার করে মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল। আমদানির সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কৃষি ও কৃষকের ওপর কীভাবে পড়বে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত