প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সঞ্চার করেছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত। উভয় দেশের নিরাপত্তা সূত্র ও সরকারি বিবৃতিতে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিস্থিতি কেবল সীমান্ত উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ সামরিক মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোলাগুলি, বিমান হামলা এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আঘাত হানার ঘটনায় ইতোমধ্যে বহু হতাহতের দাবি করা হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র দাবি করেছে, তাদের বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশ এলাকায় একটি বড় গোলাবারুদ ডিপোতে সফল হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ-কে বলেন, সীমান্তে আফগান পক্ষের কথিত উসকানিমূলক হামলার জবাবে এই পাল্টা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এতে আফগান তালেবান সরকারের অন্তত ১৩৩ জন সদস্য নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে তালেবান বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা এবং গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই তাদের সেনাবাহিনী “অপারেশন গজব-লিল-হক” নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল সীমান্তের ওপার থেকে আসা হামলার সক্ষমতা নষ্ট করা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধ করা। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযানে একাধিক সামরিক পোস্ট ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েকটি কৌশলগত অবস্থান দখলে নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি রাত দুইটা পর্যন্ত পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে বলেন, আফগান দিক থেকে উসকানিমূলক হামলার জবাবে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত ও সমন্বিত পাল্টা আঘাত হেনেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ৭২ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং অন্তত ১২০ জন আহত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ১৬টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস এবং সাতটি পোস্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তর, একটি সেক্টর কমান্ড কেন্দ্র এবং একটি বড় অস্ত্রভাণ্ডার লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন ডজনের বেশি ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে।
জাইদি সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনের জবাব তাৎক্ষণিক ও কার্যকরভাবে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আরও পাল্টা হামলা চালানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের কোনো সামরিক পোস্ট দখল হয়নি এবং কোনো সেনা নিহত বা আটক হয়নি। পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা তিনি ভারতের প্রক্সি শক্তির অপপ্রচার বলে অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তালেবান এ ধরনের হতাহতের সংখ্যা ও সামরিক ক্ষতির দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করেছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন। যদিও তালেবান সরকারের আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি এখনো প্রকাশ হয়নি, সীমান্তবর্তী স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাতভর গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং বহু মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্তের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ইসলামাবাদ বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-এর সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলার পর পাকিস্তান এই অভিযোগ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। পাকিস্তানের দাবি, ওই হামলার জবাব হিসেবেই সীমান্তপারের বিভিন্ন স্থাপনায় সামরিক আঘাত হানা হয়েছে।
আফগান পক্ষ বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেওয়া হবে না। তারা পাল্টা অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান সীমান্ত লঙ্ঘন করে নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত শুধু সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ আফগানিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর, আর পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, সীমান্তে সংঘর্ষ বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা প্রায়ই সংঘর্ষের সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জীবিকা ব্যাহত হয়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয়, ফলে মানবিক সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থী প্রবাহ বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দুই পক্ষকেই সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং উত্তেজনা কমাতে সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকায় তাৎক্ষণিক শান্তির সম্ভাবনা অনিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা এখনই কঠিন, কারণ উভয় পক্ষই নিজেদের দাবি তুলে ধরছে এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য খুব সীমিত। ফলে হতাহতের সংখ্যা বা সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানতে আরও সময় লাগতে পারে। তবু স্পষ্ট যে সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং সামান্য উসকানিও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক চাপ একত্রিত হয়ে বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই উত্তেজনা যদি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত না হয়, তবে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।