রাবিতে দোকানিকে মারধর, অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
রাবিতে দোকানির ওপর ছাত্রদল নেতার হামলা

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশে আবারও সহিংসতার একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে, যেখানে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক দোকানির ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। রোববার রাতের এই ঘটনায় দোকানিসহ দুজন আহত হয়েছেন এবং ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট দোকানটি বন্ধ রয়েছে। ঘটনাটি শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে রাত প্রায় ৮টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হিমেল কম্পিউটার নামে একটি দোকানে প্রিন্ট সংক্রান্ত কাজ করতে যান অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল কাফী। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি তিনি শহীদ হবিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রিন্টিং বিল নিয়ে মতবিরোধ থেকে। দোকান কর্তৃপক্ষের দাবি, কাফী দুটি আবেদনপত্র প্রিন্ট ও প্রসেসিংয়ের জন্য ২৮০ টাকা বিল পান। তবে তিনি এই বিল কম দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দোকানি তা প্রত্যাখ্যান করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে অভিযুক্ত কাফী দোকানিকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে কাফীসহ আরও কয়েকজন দোকানের মালিক হিমেলের ওপর হামলা চালান। চেয়ার-টেবিল ছুড়ে মারার পাশাপাশি তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরে দোকানের শাটার বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত দ্রুত ঘটে এবং কেউ তা থামানোর সুযোগ পাননি। তারা বলেন, একটি ছোট বিষয় থেকে এমন সহিংসতা অপ্রত্যাশিত এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল কাফী অবশ্য অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি ছিল একটি সাধারণ বাগ্‌বিতণ্ডা, যা পরে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানির পক্ষ থেকেও উগ্র আচরণ করা হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সিনিয়রদের উপস্থিতিতে বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছে।

তবে চেয়ার ছোড়াছুড়ির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তার মতে, হাতাহাতির সময় দোকানের আসবাবপত্র পড়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ছোড়া হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি স্বীকার করেন যে, দোকানির ওপর চেয়ার নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে এবং এটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

তিনি আরও বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে আপাতত সমঝোতা হয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করার আশ্বাস দিয়েছে। তবে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ছাত্ররাজনীতির নামে এ ধরনের আচরণ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো বিরোধ বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নেওয়া একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। এর পেছনে সহনশীলতার অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কাজ করতে পারে। তাই এসব সমস্যা সমাধানে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপই নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি ও মূল্যবোধ চর্চার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একটি সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়া। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত এসব দোকান শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায়। সেখানে যদি নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে তা পুরো ক্যাম্পাসের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত