প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর এক মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা দেয়, যা সারা দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের সময় হঠাৎ দিক হারিয়ে আছড়ে পড়ে এই প্রতিষ্ঠানের একটি ভবনের উপর। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী আহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যাও চূড়ান্ত নয় বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এ দুর্ঘটনায় বাস্তবতা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন প্রশ্ন উঠে—আসলে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী ভবনটির ভেতরে ছিলেন দুর্ঘটনার সময়? সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন সংস্থার বক্তব্যে এ সংখ্যা এখনও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্ঘটনার পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে স্কুল ভবনে প্রবেশ বন্ধ ছিল, গণমাধ্যমের প্রবেশও ছিল সীমিত। ফলে শুরু থেকেই তথ্য নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা।
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করা হলে বিধ্বস্ত ভবনের চারপাশে জড়ো হন আহতদের স্বজন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং আশপাশের উৎসুক জনতা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ ও বিমানবাহিনীর তদন্ত দল ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে আলামত সংগ্রহ করে। এক পর্যায়ে স্কুলের স্বেচ্ছাসেবকরা ভবনের চারপাশে অস্থায়ী নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে দেয়।
ভবনটি ছিল দুটি তলার। নিচতলার একটি শ্রেণিকক্ষে সরাসরি বিমানটি আছড়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রেজাউল হক জানান, এই ভবনে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস হতো। প্রতি শ্রেণি কক্ষে গড়ে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকতো। দুই তলা মিলিয়ে ২০০ এর বেশি শিক্ষার্থী ওই সময়ে ভবনে অবস্থান করছিল বলে তিনি ধারণা করেন। এর মধ্যে নিচতলার কক্ষগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেহেতু বিমানটি আছড়ে পড়েছে ভবনের মাঝ বরাবর নিচতলায়।
বিধ্বস্ত সময়টি ছিল টিফিন বিরতির, যার কারণে কিছু শিক্ষার্থী বাইরে ছিল এবং কেউ কেউ হয়তো বাসার উদ্দেশেও রওনা দিয়েছিল। তবে ক্লাস চলাকালীন সময় হলে সাধারণত ২০০-২২০ জন শিক্ষার্থী ভবনের মধ্যে অবস্থান করতো বলে শিক্ষকরা জানান। নিচতলায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ জন, যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে হতাহতদের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। সেই অভাবেই তথ্য বিভ্রান্তি বাড়ছে এবং শোকাহত স্বজনদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভ করেছে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা, যাদের ছয় দফা দাবি সরকার মেনে নিয়েছে বলে ঘোষণা আসে পরে। দাবিগুলোর অন্যতম ছিল—নিহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ এবং সঠিক সংখ্যা জনসমক্ষে আনা।
এই দুর্ঘটনার পর জাতীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, কেমন করে একটি প্রশিক্ষণযুদ্ধবিমান জনবহুল এলাকা, বিশেষত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দিয়ে উড়তে পারে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা, পরিকল্পনায় ঘাটতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
মাইলস্টোনের এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা যেন কেবল একটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা নয় এটি হয়ে উঠেছে সত্য গোপনের, দায় এড়ানোর এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে এক গম্ভীর প্রতিচ্ছবি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—নিহত ও আহতদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ, তাদের পরিবারকে পর্যাপ্ত সহায়তা, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। এ মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির সত্য জানতে চায় পুরো দেশ।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন