প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যশোর জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আবু তালেবকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদন এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি দপ্তরে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যশোর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে উপস্থিত হন কয়েকজন সাংবাদিক। সে সময় অফিস চলমান থাকলেও জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আবু তালেবকে সেখানে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকরা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানান, তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং দ্রুত অফিসে যোগ দেবেন। পরে বেলা ১১টার পর তাকে অফিসে আসতে দেখা যায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অফিসে না থাকলে সাধারণ মানুষের সেবা কার্যক্রম কীভাবে স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয়। আবার কেউ কেউ সরকারি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, বিলম্ব ও দায়বদ্ধতার সংকটের বিষয়টিও সামনে এনেছেন।
যদিও অভিযোগের বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আবু তালেব নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির কারণে তিনি ঢাকায় ছিলেন। পরে রোববার সকালে ট্রেনে যশোরে ফিরে অফিসে যোগ দেন। যাত্রাপথের কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নিয়মিত অনুপস্থিতির ঘটনা নয় এবং তিনি নিয়মিতভাবেই অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান সহকারী ফাতিমা নুসরাতও জেলা রেজিস্ট্রারের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, জেলা রেজিস্ট্রার নিয়মিত অফিস করেন এবং সেদিন কেবল ঢাকা থেকে ফিরতে গিয়ে সাময়িক বিলম্ব হয়েছিল। অন্য সময় তিনি নিয়মিত যশোরে অবস্থান করেন বলেও জানান তিনি।
তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। কয়েকজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন, জেলা রেজিস্ট্রারকে প্রায়ই অফিসের বাইরে দেখা যায়। তাদের দাবি, বিভিন্ন সময় তার অনুপস্থিতিতে সাব-রেজিস্ট্রার দায়িত্ব পালন করেন। যদিও এ ধরনের অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন আবু তালেব। তিনি বলেন, জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে তাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক সভা, দাপ্তরিক বৈঠক ও সরকারি কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়। ফলে কিছু সময় অফিসের বাইরে থাকতে হলেও সেটিকে অনুপস্থিতি হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।
যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিস প্রতিদিন শত শত মানুষের গুরুত্বপূর্ণ জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে জড়িত। জমি রেজিস্ট্রি, দলিল যাচাই, মালিকানা হস্তান্তরসহ নানা কাজে প্রতিদিন ভিড় করেন সাধারণ মানুষ। এসব সেবার সঙ্গে সময় ও আইনি জটিলতা জড়িত থাকায় কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও দ্রুত সেবা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সেবাগ্রহীতাদের অনেকে বলছেন, সরকারি দপ্তরে দীর্ঘসূত্রতা এবং কর্মকর্তাদের অনিয়মিত উপস্থিতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে জমি রেজিস্ট্রির মতো সংবেদনশীল কাজে সামান্য বিলম্বও অনেক সময় বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি জটিলতা তৈরি করে। ফলে অফিস প্রধানের সময়মতো উপস্থিতি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি অফিসে শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং সেবা সহজীকরণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে অনেক সরকারি দপ্তরে এখনও পুরোনো ধীরগতি ও অনিয়মের সংস্কৃতি রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের সক্রিয়তার কারণে এখন এসব বিষয় দ্রুত জনসমক্ষে চলে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো অভিযোগ সত্য হলে তা সেবার মান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার ভিত্তিহীন অভিযোগ হলে সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা জরুরি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনেকেই সরকারি অফিসে বায়োমেট্রিক হাজিরা, নিয়মিত মনিটরিং এবং নাগরিক সেবা মূল্যায়ন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, সাধারণ কর্মচারীদের ক্ষেত্রে উপস্থিতির নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই জবাবদিহিতা দেখা যায় না।
যশোরের স্থানীয় নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি মনে করেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি অফিস মানেই যদি বিলম্ব, অনুপস্থিতি বা সেবায় অনীহা—এমন ধারণা তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ে।
অন্যদিকে জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেবের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তাকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ অতিরঞ্জিত। তাদের দাবি, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের কারণেই অনেক সময় বিভিন্ন সভা ও সরকারি কাজে অংশ নিতে হয়। ফলে অফিসের বাইরে থাকলেই সেটিকে দায়িত্বে অবহেলা বলা যাবে না।
তবে বাস্তবতা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের এই যুগে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণের মধ্যে চলে এসেছে। ফলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা এবং জনসেবামুখী আচরণ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যশোর জেলা রেজিস্ট্রারকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কী পর্যায়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ঘটনাটি আবারও সরকারি দপ্তরগুলোর জবাবদিহিতা, সেবার মান এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নটিকে সামনে এনে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন দেখতে চায়—অভিযোগ সত্য হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, আর যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সেটিও পরিষ্কারভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে কি না।