প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজার সফরের শুরুতেই বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক পাতলী খালের পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর কক্সবাজার সফরে এসে তিনি এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয়ের কথাও তুলে ধরেন। স্থানীয় জনগণ, বিএনপির নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে এ উপলক্ষে কক্সবাজারের পিএমখালী এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শনিবার সকালে ঢাকা থেকে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটে কক্সবাজার পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এরপর তিনি সরাসরি রওনা দেন পিএমখালীর ঐতিহাসিক পাতলী খালের দিকে, যেখানে পুনঃখনন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়।
স্থানীয়দের মতে, পাতলী খাল কেবল একটি জলপ্রবাহের পথ নয়, বরং কক্সবাজার অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ঐতিহাসিক অবকাঠামো। বহু বছর ধরে পলি জমে এবং বিভিন্ন কারণে খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় এর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচসংকটের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় স্থানীয় কৃষকদের। পুনঃখনন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাতলী খালের সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি যে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, পাতলী খাল ছিল সেই বৃহৎ উদ্যোগের অন্যতম অংশ। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে জিয়াউর রহমান নিজে এই এলাকায় এসে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন বলে স্থানীয় প্রবীণরা স্মরণ করেন। সে সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখনন ও নতুন খাল খননের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা উন্নত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের উদ্বোধনী কর্মসূচি সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন এবং প্ল্যাকার্ড নিয়ে তাকে স্বাগত জানান। সকাল থেকে টানা বৃষ্টি হলেও উৎসাহে ভাটা পড়েনি। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ তাদের নেতাকে শুভেচ্ছা জানান এবং কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নদী, খাল ও জলাশয়গুলো দেশের পরিবেশ, কৃষি এবং অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল এবং নাব্যতা সংকটের কারণে বহু খাল তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা, কৃষিতে সেচসংকট এবং পরিবেশগত ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। এ প্রেক্ষাপটে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পাতলী খালের পুনঃখনন একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিকল্পনার অংশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রথম ধাপে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে কাজও শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কেবল খাল খনন নয়। একই সঙ্গে খালের দুই পাড় সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বৃক্ষরোপণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে জলপথ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কক্সবাজারের পিএমখালী এলাকার বাসিন্দারা মনে করেন, পাতলী খাল পুনঃখনন হলে বহু বছর ধরে জমে থাকা সমস্যার সমাধান হবে। কৃষকরা সহজে জমিতে সেচ দিতে পারবেন। মাছের উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি বৃষ্টির সময় পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও কমে আসবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আশা করছেন, জলপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় পর কক্সবাজারে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন, যা সরাসরি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে উন্নয়ন, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি প্রতীকী বার্তাও এই সফরের মাধ্যমে উঠে এসেছে।
দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর রাতে প্রধানমন্ত্রী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করার কথা রয়েছে। তবে তার এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে পাতলী খালের পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন। স্থানীয় জনগণ আশা করছেন, ঐতিহাসিক এই খাল আবারও তার হারানো প্রাণ ফিরে পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে টিকে থাকবে।