অর্থায়নে নতুন পথের আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • ৪৮ বার

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির রূপান্তর, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগের নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সরকারি অর্থায়নের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ব্যাংক ঋণ ও সরকারি কোষাগারনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাই অর্থায়নের উৎসকে আরও বহুমুখী এবং আধুনিক করতে হবে।

শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিক কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন মূলত ব্যাংক ঋণ এবং সরকারি কোষাগারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই মডেল ক্রমশ ব্যয়বহুল এবং সীমিত হয়ে উঠছে। ফলে নতুন আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বিশেষভাবে ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং’ বা সমন্বিত অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থ, উন্নয়ন সহযোগীদের তহবিল, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং মূলধন বাজারভিত্তিক অর্থায়নকে একত্রিত করে একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অর্থায়নের অসংখ্য বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সিং, প্রাইভেট ফান্ড, ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যাংকের বাইরে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও ব্যাংকিং খাতকেও প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন আর্থিক কাঠামো গ্রহণ করতে হবে।

সরকারের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত এক দশকে ঋণের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক সংস্থাগুলো থেকে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও এখন সেই সুবিধা অনেক কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক ঋণের সুদের হার বেড়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ হিসেবে দেখা হয়। কারণ ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হলে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের ‘ফিসকাল স্পেস’ বা আর্থিক পরিসর ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তিনি দেশের মূলধন বাজারকে শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার মতে, বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের অর্থায়নের প্রধান উৎস হওয়া উচিত মূলধন বাজার। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শেয়ার, বন্ড কিংবা অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং অর্থায়নের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংক থেকে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নেয় এবং একই সময়ে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ৭ থেকে ৮ শতাংশ ব্যয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ব্যয়ের ব্যবধান বিশাল হবে। ব্যবসার লাভজনকতা নির্ধারণে অর্থায়নের খরচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ সুশাসনভিত্তিক ও পেশাদারভাবে পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফার হার সাধারণত ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি ঋণের সুদের হার অত্যধিক বেশি হয়, তাহলে সেই মুনাফার বড় অংশ অর্থায়নের ব্যয়ে চলে যায়। ফলে ব্যবসার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেগুলোকে প্রকৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতোই পরিচালিত হওয়া উচিত। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিয়ত সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।

তিনি বলেন, সরকারি মালিকানা থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে লোকসান বহন করে টিকিয়ে রাখা যায় না। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে তাকে ব্যবসার নিয়ম অনুসরণ করে চলতে হবে। নিজেদের অর্থ সংগ্রহ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং লাভজনকতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদেরই নিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী মনে করেন, অতীতে সরকারি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে লোকসানের বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারের ওপর গিয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে এবং করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করতে হয়। ভবিষ্যতে এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। বাংলাদেশকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা, শক্তিশালী মূলধন বাজার, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বাংলাদেশের অর্থায়ন কাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, সীমিত রাজস্ব আহরণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে অর্থায়নের নতুন উৎস খুঁজে বের করা আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত