বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিল বাংলাদেশ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারিয়ে শুধু গুরুত্বপূর্ণ দুই পয়েন্টই অর্জন করেনি টাইগ্রেসরা, একই সঙ্গে গড়েছে নতুন ইতিহাস। প্রথমবারের মতো নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এক আসরে একাধিক ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সাউদাম্পটনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিং এবং মাঠের কৌশলগত প্রয়োগ—সব বিভাগেই দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বাধীন দল।

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। সেমিফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই চাপকে শক্তিতে পরিণত করে শুরু থেকেই লড়াকু মনোভাব প্রদর্শন করেন টাইগ্রেসরা। যদিও ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল বেশ হতাশাজনক। টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

ইনিংসের শুরুতে পাকিস্তানি বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না বাংলাদেশের ব্যাটাররা। মাত্র ১৩ রানের মধ্যে ফিরে যান দিলারা আক্তার, শারমিন আক্তার সুপ্তা ও জুয়াইরিয়া ফেরদৌস। স্কোরবোর্ডে রান কম থাকলেও উইকেট হারানোর ধাক্কা ছিল আরও বড়। এমন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি এবং সোবহানা মোস্তারী।

দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিং ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশকে। ঝুঁকিপূর্ণ শট এড়িয়ে স্ট্রাইক রোটেশনের মাধ্যমে ইনিংস গড়তে থাকেন তারা। মোস্তারী ১৯ বলে ২২ রান করে আউট হলেও তার ইনিংসটি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে দেয়। অন্যদিকে অধিনায়ক জ্যোতি ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে ৩৮ বলে ৩৬ রান করেন। দলের সংকটময় সময়ে তার ইনিংস বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রহের পথে এগিয়ে নেয়।

তবে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় শেষ দিকে। স্বর্ণা আক্তারের সাহসী ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং পাকিস্তানের বোলিং পরিকল্পনাকে ভেঙে দেয়। মাত্র ২২ বলে অপরাজিত ৩৯ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। পাঁচটি চারের মার সমৃদ্ধ এই ইনিংস বাংলাদেশের স্কোরকে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দেয়। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১২৩ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের হয়ে অধিনায়ক ফাতিমা সানা দুটি উইকেট শিকার করেন। এছাড়া তাসমিয়া রুবাব, নাশমা সাধু, তুবা হাসান এবং সাদিয়া ইকবাল একটি করে উইকেট নেন। তবে বাংলাদেশের শেষদিকের ব্যাটিংয়ের সামনে তারা কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি।

১২৪ রানের লক্ষ্য বড় না হলেও বিশ্বকাপের চাপ এবং বাংলাদেশের শক্তিশালী স্পিন আক্রমণ পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শুরুতে অবশ্য আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল পাকিস্তানকে। ওপেনার গুল ফিরোজা ও মুনীবা আলি সতর্কতার সঙ্গে ইনিংস গড়ে তোলেন। প্রথম ছয় ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৪১ রান সংগ্রহ করে পাকিস্তান। তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই তাদের দিকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল।

ঠিক সেই সময় বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন অভিজ্ঞ স্পিনার নাহিদা আক্তার। প্রথমে ২৩ রান করা গুল ফিরোজাকে এবং পরে ২৫ রান করা মুনীবা আলিকে আউট করে পাকিস্তানের শক্ত ভিত ভেঙে দেন তিনি। এই দুই উইকেটের পরই ম্যাচের গতি বদলে যেতে শুরু করে।

নাহিদার আঘাতের পর পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে অস্থিরতা দেখা দেয়। সেই সুযোগ কাজে লাগান সানজিদা আক্তার মেঘলা। দ্রুত দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি পাকিস্তানকে আরও চাপে ফেলে দেন। মধ্য ওভারে বাংলাদেশি বোলাররা অসাধারণ শৃঙ্খলা বজায় রেখে রান প্রবাহ আটকে রাখেন। ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং সেই চাপ থেকেই একের পর এক ভুল শট খেলে উইকেট হারাতে থাকে পাকিস্তান।

বিশেষভাবে নজর কাড়েন রাবেয়া খান। তার করা উইকেট-মেইডেন ওভার ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই ওভার পাকিস্তানের রান তোলার গতি প্রায় থামিয়ে দেয়। ক্রমেই বাড়তে থাকা রানরেটের চাপ পাকিস্তানের ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়।

শেষ দিকে পাকিস্তান অধিনায়ক ফাতিমা সানা কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কয়েকটি আক্রমণাত্মক শট খেলে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও নাহিদা আক্তার তার ইনিংসের ইতি টেনে দেন। এরপর পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়। শেষ তিন ওভারে বড় রান প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি পাকিস্তান।

নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তানের সংগ্রহ থামে ১০০ রানে। ফলে ২৩ রানের দারুণ এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। বোলিং বিভাগে নাহিদা আক্তার ও সানজিদা আক্তার মেঘলা তিনটি করে উইকেট নেন। এছাড়া রাবেয়া খান এবং রিতু মনি একটি করে উইকেট শিকার করেন।

এই জয়ের গুরুত্ব শুধু একটি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। চলমান বিশ্বকাপে এর আগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই জয় বাংলাদেশের সেমিফাইনালের আশা আরও উজ্জ্বল করেছে। একই সঙ্গে দলটির আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই বিশ্বকাপে। একসময় বড় দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাই ছিল চ্যালেঞ্জ। এখন সেই বাংলাদেশই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে নতুন ইতিহাস লিখছে। দলের তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সমন্বয়, স্পিন নির্ভর বোলিং আক্রমণ এবং চাপের মুহূর্তে লড়াই করার মানসিকতা বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতেও যদি একই ধরনের শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারে টাইগ্রেসরা, তাহলে আরও বড় সাফল্যের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক জয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত