প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, শুধু ডিএমপির একার পক্ষে এসব যানবাহন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা শহর থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লেক রোডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা দায়ের ও যানবাহন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রাজধানীর যানজট ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এসব যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যান চলাচলে ধীরগতি, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এগুলোর সংখ্যা, নিবন্ধন ও চলাচলের সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব। রাজধানীতে ঠিক কতসংখ্যক এ ধরনের যান চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। ফলে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। যানবাহনের অনুমোদন, নিবন্ধন, রুট নির্ধারণ এবং পরিচালনা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
এদিকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে এআই ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী যানবাহন শনাক্ত করা হচ্ছে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার জানান, রাজধানীর ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ক্রসিংয়ে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা চালুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মামলা করা হয়েছে এবং ৩৮ হাজার সমন জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে ট্রাফিক সিগন্যালে আইন অমান্যকারী যানবাহন থামাতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের অনেক সময় শারীরিকভাবে ছুটতে হতো। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু হওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন আইন ভঙ্গের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে। এই ব্যবস্থায় কোনো গাড়ি ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ক্যামেরা সেটি শনাক্ত করে। পরে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলা দেওয়া হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে নগরীর যান চলাচল আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা সম্ভব।
তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই নেই নির্দিষ্ট নিবন্ধন বা মালিকানা তথ্য। ফলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়।
রাজধানীর সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা একদিকে যেমন স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম, অন্যদিকে এটি যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে সরু সড়ক, ব্যস্ত মোড় এবং প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার আগে বিকল্প ব্যবস্থা, চালকদের জীবিকা এবং নগর পরিবহনের সামগ্রিক চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত।
ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, রাজধানীর যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের সমস্যা সমাধানে পুলিশ এককভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। প্রয়োজন হবে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয় এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
এদিকে এআই ক্যামেরার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এখন দেখার বিষয়, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার কতটা কার্যকর সমাধান করা যায়।