প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেও চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এক লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও অর্থবছরের শেষ দিকে এসে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শুল্ক স্টেশন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ আয় বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের এই অগ্রগতি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গতি ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন কার্যক্রমেও দেখা গেছে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরে কনটেইনার, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং জাহাজ আগমনের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ডের পথে রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে গতি ফেরায় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
এর মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের জন্য এক লাখ দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে এসে নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে কম রাজস্ব আদায় হলেও গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা, সেখানে এবার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে নজরদারি বৃদ্ধি, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির প্রবণতা কমে যাওয়া, আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং শুল্ক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো।
তিনি জানান, কাস্টমসের কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার ও তদারকি জোরদার করার ফলে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর পাশাপাশি পণ্য খালাস প্রক্রিয়াতেও কিছুটা গতি এসেছে।
অন্যদিকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চলতি অর্থবছরে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখিয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ১৩ কোটি ৬৭ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করেছে। গত বছরের তুলনায় এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া এ সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আগমনের সংখ্যাও বেড়েছে। মোট ৪ হাজার ২৯০টি জাহাজ বন্দরে এসেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, কার্গো, কনটেইনার এবং জাহাজ আগমনের সব সূচকেই বন্দর নতুন রেকর্ডের পথে রয়েছে। তিনি জানান, বন্দর কার্যক্রম আরও দক্ষ ও আধুনিক করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজস্ব আদায় ও বন্দর কার্যক্রমে অগ্রগতি হলেও এখনো কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে। বিশেষ করে আমদানি করা পণ্যের গুণগত মান যাচাই, মূল্য নির্ধারণ এবং পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক সময় আমদানিকৃত পণ্যের পরীক্ষা ও মূল্যায়নের জন্য তাদের চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা বাড়ানো গেলে পণ্য ছাড়ের গতি বাড়বে এবং বাণিজ্য আরও সহজ হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। ফলে পণ্যের মূল্যায়ন ও ছাড় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়।
তিনি মনে করেন, কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করা গেলে রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানো সম্ভব।
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আমদানি-রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশ থাকায় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় বেশি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে।
তবে শিল্পখাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সংকট এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. রফিক চৌধুরী বলেন, বন্দর ও কাস্টমসের সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। কনটেইনারভিত্তিক আমদানি-রফতানির প্রায় ৯৮ শতাংশও পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।
অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি শুধু রাজস্ব আদায় নয়, দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক পরিবেশের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্রুত পণ্য খালাস ব্যবস্থা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
চলতি অর্থবছরের চিত্র বলছে, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলেও রাজস্ব ও বন্দর কার্যক্রমে যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিতে আস্থার একটি বার্তা দিচ্ছে।