প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার আকাশ-বাতাস এখন কেবলই আহাজারিতে ভারি। প্রকৃতির এক চরম রুদ্ররোষে দেশটির লা গুয়াইরা থেকে কারাকাস পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। গত পাঁচদিন ধরে চলা ধ্বংসলীলায় প্রাণের স্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিধ্বংসী এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১ হাজার ৭১৯ জন অতিক্রম করেছে, যা মুহূর্তের ব্যবধানে আরও বাড়ছে। ধ্বংসস্তূপের স্তরে স্তরে চাপা পড়ে আছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব বলছে, আহত মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৩৪ জন এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অন্তত ১৫ হাজার ৮৬৬ জন মানুষ। এই বিপর্যয় যেন ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে লেখা হয়ে যাচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানের প্রতিটি ক্ষণ যেন এখন জীবন-মরণের টানাপোড়েন। একদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধারকারীরা কাজ করছেন, অন্যদিকে বারবার আঘাত হানা আফটারশক উদ্ধার তৎপরতাকে করে তুলছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সোমবার দুপুরে আবারও ৪ দশমিক ৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী আফটারশক আঘাত হানায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারাকাস ও লা গুয়াইরার বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ফেলে আবারও রাস্তায় নেমে এসেছেন। গত পাঁচদিন ধরে এমন ভীতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলছে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের অনুসন্ধান। স্বজন হারানো মানুষগুলোর আর্তনাদ আর উদ্ধারকারীদের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের দৃশ্য এখন বিশ্ববাসীর হৃদয়ে কাঁপন ধরাচ্ছে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে মানুষের ক্ষোভ আর হতাশা এখন চরমে। লা গুয়াইরা ও কাতিয়া লা মারের মতো শহরগুলোতে মানুষের অভিযোগ, ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরকারি ত্রাণ তৎপরতার ধীরগতি পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। ধ্বংসাবশেষের স্তূপে যখন প্রিয়জনের সন্ধানে স্বজনরা হাতুড়ি, কোদাল আর খালি হাতে মাটি খুঁড়ছেন, তখন তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠছে তীব্র অসহায়ত্ব। অনেক পরিবার এখন আর জীবিত স্বজনের ফেরার আশা করছেন না, বরং অন্তত মৃতদেহটুকু হাতে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। উদ্ধারকারীদের কাছে পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে জনরোষ দানা বাঁধছে, তা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবেও উত্তপ্ত করে তুলছে।
এই বিপর্যয় মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা একে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিপর্যয় সামাল দিতে সরকারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী দল ও সরঞ্জামের অভাবে স্থানীয় জনগণ বাধ্য হয়েই নিজ উদ্যোগে ত্রাণকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যদিও রাজধানী কারাকাস থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি অঞ্চলে রেডক্রস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার কর্মীরা কাজ করছেন, তবুও ধ্বংসের ব্যাপকতা এতোটাই বেশি যে সবকিছুকে সমানভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ভেনেজুয়েলার এই দুঃসময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্তত ২৪টি দেশ থেকে মানবিক সহায়তা ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী, ২ হাজার ৭০০ বিদেশি উদ্ধারকর্মী এবং ৮৬টি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী কুকুরের দল উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনছে, তবুও উদ্ধার হওয়া মানুষগুলোর সংখ্যা যেন সামগ্রিক নিখোঁজ তালিকার তুলনায় খুবই নগণ্য। প্রতিটি ঘণ্টায় ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন নতুন কোনো প্রাণের সংকেত পাওয়া যাচ্ছে, তখন উপস্থিত সবার মাঝে এক অদ্ভুত আশার সঞ্চার হচ্ছে, আবার যখন নিথর দেহ উদ্ধার হচ্ছে, তখন নেমে আসছে গভীর শোকের ছায়া।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের ভয়াবহতা শুধু কাঠামোগত ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেক জায়গায়। লা গুয়াইরার মতো বন্দরনগরীগুলো এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো এবং উদ্ধারকারী দলের জন্য পথ তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষগুলোর অক্সিজেন কমে আসা এবং খাদ্য-পানির অভাব এখন সবচেয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যত সময় গড়াচ্ছে, অলৌকিকভাবে কারো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
ভেনেজুয়েলার এই সংকটে পুরো বিশ্ব আজ একাত্মতা প্রকাশ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ছবিগুলো দেখে বিশ্ববাসী স্তব্ধ। বিধ্বস্ত ভবনের সারি, ধুলোবালিতে মাখামাখি শিশুদের মুখ, আর স্বজনদের হারিয়ে বিলাপ করা মা-বাবাদের ছবি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। এই বিপর্যয় শুধু ভেনেজুয়েলার একার নয়, এটি মানবসভ্যতার এক কঠিন পরীক্ষা। উদ্ধার তৎপরতা চলবে আরও কয়েক দিন, এবং এরপর শুরু হবে পুনর্গঠনের দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু যারা তাদের আপনজনদের হারিয়েছেন, তাদের জীবনে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা হয়তো কোনোদিনও মুছে যাবে না। প্রকৃতি যখন তার রুদ্র রূপ ধারণ করে, তখন মানুষ যে কতটা অসহায়, তা আবারও প্রমাণিত হলো এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে। এখন শুধু প্রার্থনা, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা শেষ মানুষটি যেন অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসে এবং এই মৃত্যুর মিছিল যেন দ্রুত থমকে দাঁড়ায়।