প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের ভয়াবহতার খবর থেকে মনোযোগ সরিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার দিকে তাকালে দেখা যায়, আর্থিক খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার এক কঠোর অবস্থানে উপনীত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংক খাতে যে লুটপাটের মহোৎসব চলেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার ছিল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আজ বিপর্যস্ত। জনগণের আমানতের পাহাড় গড়ে তোলার বদলে এসব ব্যাংককে পরিণত করা হয়েছিল ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের খনিতে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি নিয়ে পুরো ব্যাংক খাতে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক ঘোষণার মাধ্যমে তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারাটি ছিল এমন একটি আইনি জটিলতা, যা বিগত দিনের ব্যাংক লুণ্ঠনকারীদের আবারও মালিকানার চেয়ারে বসার সুযোগ করে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। এই ধারার অপব্যাখ্যায় মূলত এস আলম গ্রুপের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পুনরায় ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ফেরার পথ প্রশস্ত হচ্ছিল। এটি কেবল আইনের শাসনকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেনি, বরং সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এক গভীর আস্থাহীনতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং অর্থনীতিবিদরা শুরু থেকেই এই ধারাটির তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, যারা প্রতিষ্ঠানের মূলধন ঘাটতি তৈরি করেছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, তাদের অর্থ দিয়েই আবারও মালিকানা কেনার সুযোগ দেওয়া নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং এটি অপরাধীদের আইনি বৈধতা দেওয়ার শামিল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার এই বিতর্কিত ধারাটি বিলোপ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার এই বক্তব্যটি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই বার্তাটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও আশঙ্কার ওপর একটি প্রলেপ হিসেবে কাজ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগের প্রতিও এক প্রকার সম্মান প্রদর্শন। এই সংস্থাগুলো বারবার সতর্কতা জারি করে বলেছিল যে, অপরাধী মালিকদের ফেরার পথ উন্মুক্ত থাকলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
বর্তমানে এই পাঁচটি একীভূত ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষত কতটা গভীর। ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ইতিমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এটি মোট ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশের বেশি, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। এই বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং এর ফলে তৈরি হওয়া মূলধন ঘাটতি দেশের পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ব্যাংকগুলোর এই বেহাল দশা কাটিয়ে উঠতে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে হয়েছে। সরকার নিজে ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন হিসেবে দিয়েছে, যা সাধারণ করদাতাদেরই অর্থ। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধারের মাধ্যমে ৩৬ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে আরও ১২ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে।
এই বিশাল অংকের অর্থ যখন জনগণের পকেট থেকে যাচ্ছে, তখন যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদেরই ফেরার সুযোগ দেওয়াটা ছিল এক চরম উপহাস। তাই আইন সংশোধনের এই প্রক্রিয়াটি কেবল ব্যাংকিং সংস্কারের অংশ নয়, এটি ন্যায়বিচারের লড়াইও বটে। আইনি লড়াইয়ে এই জয় পাওয়ার পর এখন ব্যাংকগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত লুট হওয়া অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনা। ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করেছে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য। এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ হলেও, সরকারের বর্তমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তা অসম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ এখন এটাই দেখতে চায় যে, শুধু আইন পরিবর্তন নয়, বরং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর ভূমিকা। আগে শোনা যেত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে খুব একটা হস্তক্ষেপ করত না, যার সুযোগ নিয়ে এস আলমসহ অন্যান্যরা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ লুটপাট করেছে। এখন যেহেতু আইন থেকে বিতর্কিত ধারাটি সরে যাচ্ছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার স্বাধীন দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক হতে হবে। একীভূত ব্যাংকগুলোর পরিচালনার জন্য যে শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট নিরসনে সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করছেন, যদি লুটপাটে জড়িতদের ফিরতে না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীই ব্যাংককে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করার সাহস পাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, ভেনেজুয়েলার মতো একটি দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের আর্তনাদ যেমন একটি দেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়, তেমনি আমাদের ব্যাংকিং খাতের এই লুণ্ঠন ছিল আমাদের অর্থনীতির এক মানবিক বিপর্যয়। সেখানেও মানুষ নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়ে পথে বসেছে, এখানেও মানুষ ব্যাংকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে নিজের জমানো টাকা তোলার জন্য। একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে আমরা আশা করি, ১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের এই অন্ধকার অধ্যায়টি শেষ হবে। ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব। আশা করি, অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবে রূপান্তর হবে এবং ব্যাংক খাত আবারও প্রকৃত বিনিয়োগ ও উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে উঠবে। জনগণের এই লড়াইয়ে সত্য ও ন্যায়ের জয় হোক এবং লুটপাটকারীদের জন্য বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চিরতরে দরজা বন্ধ হয়ে যাক।