প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো মুসলিম বিশ্বে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় এই নেতার মৃত্যু হয়। এই শোকাবহ ঘটনার পর থেকেই ইরানজুড়ে চলছে এক নজিরবিহীন পরিবেশ। সেই ধারাবাহিকতায় তার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য ও জানাজার নামাজ আয়োজন করা হয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তেহরানে যাচ্ছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আগামী ২ জুলাই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা থেকে তেহরানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। ইরানের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, ৪ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৯ জুলাই পর্যন্ত তেহরান, কোম এবং মাশহাদ শহরে এই শোকানুষ্ঠান ও শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে স্পিকারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করবে, যা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতারই প্রতিফলন। শুধু স্পিকার নন, জাতীয় সংসদের একাধিক সংসদ সদস্যও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বাংলাদেশের জনমনে ইরানের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান কেবল একটি শেষকৃত্য নয়, বরং এটি দেশটির ঐক্য ও সংহতির এক অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশা করছে যে, রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে ধর্মীয় কেন্দ্র কোম এবং খামেনির জন্মস্থান মাশহাদ পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। এই বিপুল জনসমাগমকে ঘিরে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। ৪ জুলাই তেহরান ও কোম শহরে মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে এবং পরবর্তীতে ৯ জুলাই মাশহাদ শহরে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই সফর বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে, কারণ এমন এক কঠিন সময়ে বাংলাদেশের উপস্থিতি ইরান সরকার ও জনগণের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা পুরো বিশ্বকে এক উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তবে সেই উত্তেজনা ছাপিয়ে এখন ফোকাস সরে এসেছে একটি মহান নেতার বিদায় সংবর্ধনার দিকে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই সফরকালে তিনি ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বনেতৃত্বের প্রতি একটি জোরালো সংহতি বার্তা পৌঁছে দেবে।
মাশহাদ শহরে দাফন সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের ইতি ঘটবে। দেশটির সাধারণ জনগণ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জানাজার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশাল জনস্রোত সামাল দেওয়ার মতো বিশেষ ব্যবস্থাপনা। স্পিকারের সফর সঙ্গী হিসেবে যারা যাচ্ছেন, তারা জানাজার মূল পর্বসহ দাফনের সকল প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকবেন। ইরানের জনগণের এই শোকের দিনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ দুই দেশের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো সফর নয়, বরং এটি মানবিক অনুভূতির এক গভীর প্রকাশের মঞ্চ, যেখানে বিশ্বনেতারা সমবেত হচ্ছেন মানবতার এক অপূরণীয় ক্ষতিকে স্মরণ করতে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জানাজায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইরানের বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিশ্বনেতাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ সম্পর্কে অবগত হবেন। আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবার দৃষ্টি ইরানের ওপর। খামেনির প্রয়াণের পর ইরান তার নতুন নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক পথরেখা কীভাবে নির্ধারণ করবে, তা নিয়েও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরান একটি কৌশলগত অংশীদার। স্পিকারের এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দায়িত্বশীল ও বন্ধুপ্রতিম মনোভাবের প্রমাণ রাখবে।
সবকিছু মিলিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় একটি অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে লিপিবদ্ধ হতে যাচ্ছে। যখন কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের নেতাকে বিদায় জানাবে, তখন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সেখানে উপস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে একটি বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। শোকের এই আবহকে শক্তিতে রূপান্তর করে ইরান তার পরবর্তী গন্তব্য খুঁজে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্পিকারের এই সফর সফল হোক এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক—এটাই এখন সাধারণ মানুষের কাম্য। ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি পর্ব অত্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে থাকবে, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলে আশা করা যায়।