সর্বশেষ :
সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের মিশ্র অভিজ্ঞতা: জয় ও তিন ধাক্কা পোশাক ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে সংসদে রুমিন ফারহানার সরব উপস্থিতি এআই চিপে দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণে ফ্রান্সের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ডেপুটি গভর্নর সরোয়ার হোসেন পূবালী ব্যাংকে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ বাকপ্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ: যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ব্যাংক লুটপাটে জড়িতদের ফেরার পথ বন্ধ, বাতিল হচ্ছে ১৮(ক) ধারা খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দেবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে আর্তনাদ, ভেনেজুয়েলায় মৃত্যুর মিছিল ১৮০০ ছুঁইছুঁই

বাকপ্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ: যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার
বাকপ্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ: যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশ:  ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ন্যায়বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর দীর্ঘশ্বাস শেষে অবশেষে আলোর মুখ দেখল ঠাকুরগাঁওয়ের এক বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীর পরিবার। মানবিকতা ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের এক বিভীষিকাময় অধ্যায় ছিল ২০১৫ সালের সেই রাত, যখন এক লম্পট প্রতিবেশী কেড়ে নিয়েছিল এক কিশোরীর স্বাভাবিক জীবন। প্রায় ১১ বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। আদালতের বিচারক আলী মনসুর প্রধান আসামি মো. আব্দুল মমিনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। এই রায়ের মাধ্যমে শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়নি, বরং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য এক বিশাল আর্থিক নিরাপত্তার পথও সুগম হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে টিকে থাকবে।

ঘটনাটি ছিল তৎকালীন রাণীশংকৈল উপজেলার ভাংবাড়ী গ্রামের এক দুঃসহ স্মৃতি। কিশোরীর মা যখন কাজের প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই সুযোগটিই নিয়েছিল নরপিশাচ আব্দুল মমিন। ঘরে একা থাকা বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীটির আর্তনাদ সেদিন হয়তো কোনো মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মা ফিরে এসে নিজ চোখে যা দেখেছিলেন, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। তিনি বাধা দিতে গেলে অভিযুক্ত ধর্ষক তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় মেয়েটিকে উদ্ধার করা হলেও তার ওপর দিয়ে যে মানসিক ঝড় বয়ে গিয়েছিল, তা বর্ণনাতীত। দীর্ঘ সময় ধরে বিচার পাওয়ার আশায় স্থানীয়ভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার মেলেনি ওই অসহায় পরিবারটির। অবশেষে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়া এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আজ সত্যের জয় হয়েছে।

রায়ের সবচেয়ে মানবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ক্ষতিপূরণের বিষয়টি। আদালত শুধু কারাদণ্ড দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং দণ্ডিতের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে দুই লাখ টাকা আদায় করে তা ভুক্তভোগীকে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি দণ্ডিতের বর্তমান সম্পদ দিয়ে এই টাকা পূরণ না হয়, তবে ভবিষ্যতে তার অর্জিত যেকোনো সম্পদ থেকেও এই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। আইন ও ন্যায়বিচারের এই কঠোর অবস্থান সমাজে অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। একই মামলায় অভিযুক্ত অন্য এক আসামি মো. এরশাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে আমাদের বিচার ব্যবস্থা কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে এই পরিবারটি যে আইনি লড়াই চালিয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। প্রতি পদে বাধা, সমাজের বাঁকা নজর আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা বিচার পাওয়ার আশা টিকিয়ে রেখেছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. এনতাজুল হক যথার্থই বলেছেন, এই রায় ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের সংগ্রামের এক সার্থকতা। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভুক্তভোগীর জন্য নির্ধারিত এই ক্ষতিপূরণ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যে ভেঙে পড়ছে, এটি তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।

এই মামলার রায়টি কেবল একটি অপরাধের বিচার নয়, বরং এটি সমাজকে মনে করিয়ে দেয় যে, শারীরিক বা বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় অংশ। তাদের ওপর ঘটা যেকোনো ধরনের নির্যাতন কেবল ব্যক্তির ওপর নয়, বরং পুরো জাতির বিবেককে দংশন করে। ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনা আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করে যে, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং শাস্তি নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। যখন আদালত ঘোষণা করেন যে ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে অপরাধীর সব সম্পদ নিলামে তোলা হবে, তখন তা অপরাধের শিকার মানুষের জন্য একটি বড় আশার আলো। সমাজের প্রতিটি প্রান্তে যদি এমন কঠোর ও মানবিক রায় কার্যকর হয়, তবেই অপরাধীদের মনে আইনের শাসন সম্পর্কে ভীতির সৃষ্টি হবে।

ভবিষ্যতে এই রায়ের আলোকবর্তিকা দেশের অন্যান্য আদালতের রায়ের ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ধর্ষণ বা নির্যাতনের মতো মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু এই দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে বিজয় অর্জন প্রমাণ করে যে, ধৈর্য ও সাহসের সাথে আইনি লড়াই চালিয়ে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। ঠাকুরগাঁওয়ের এই বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীর জন্য আজকের এই রায় শুধু আইনগত জয় নয়, এটি তার হারানো মর্যাদার পুনর্লাভের এক ক্ষুদ্র প্রয়াস। সমাজের মানুষ আশা করে, সরকার ও প্রশাসন একইভাবে দেশের প্রতিটি এমন মামলার বিচার ত্বরান্বিত করবে এবং অপরাধীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সুখী ও নিরাপদ দেশ গড়ার পূর্বশর্ত হলো নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঠাকুরগাঁওয়ের এই রায় সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি ছোট হলেও শক্তিশালী পদক্ষেপ। এই রায়ের ফলে ভুক্তভোগী পরিবার যে আর্থিক ও মানসিকভাবে কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য। অপরাধী মমিন তার কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত সাজা পেয়েছে, যা আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে আমরা ন্যায়বিচারের এই জয়কে স্বাগত জানাই এবং আশা করি, আমাদের বিচার ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও জনকল্যাণমুখী ভূমিকা পালন করে যাবে। যারা অপরাধের শিকার হয়েও বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন, তাদের জন্য এই রায় অবশ্যই এক বড় অনুপ্রেরণা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত