প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রক্তের সম্পর্কের পবিত্রতা যে কতটা কলঙ্কিত হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার একটি ঘটনা। জন্মদাত্রী মাকে পরম মমতায় আগলে রাখার পরিবর্তে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নিজের হাতেই মাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে এক পাষণ্ড সন্তান। গত ২৫ জুন মতলব উত্তর উপজেলার কলাকান্দা ইউনিয়নের একটি নির্জন কলাবাগান থেকে এক অজ্ঞাত নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তি ও নিরলস গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে পুলিশ সেই হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে এবং ঘাতক ছেলেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনায় শুধু একটি প্রাণই ঝরেনি, বরং মা-সন্তানের অমোঘ সম্পর্কের ওপর এক গভীর কালো দাগ পড়েছে।
নিহত মায়ের নাম মজিদা বেগম, যার বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৫০ বছর। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, প্রথম দর্শনে পরিচয় শনাক্ত করা ছিল পুলিশের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। মরদেহের মাথার খুলির চুল খসে গিয়েছিল এবং বন্যপ্রাণীর আক্রমণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকৃত হওয়ায় এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তা নিয়ে শুরুতে ধোঁয়াশা ছিল। তবে পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল হাল ছাড়েনি। মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জাবীর হুসনাইন সানীবের নেতৃত্বে এবং মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস তদন্ত। প্রতিটি ক্লু বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুলিশ শেষ পর্যন্ত সন্দেহের তীর নিয়ে পৌঁছায় নিহতের নিজের ছেলে মো. জনির দিকে।
গ্রেপ্তারকৃত ২৬ বছর বয়সী মো. জনি ঢাকার উত্তরা এলাকায় ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে তার মায়ের হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। জনির ভাষ্যমতে, ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার বিচ্ছিন্ন পারিবারিক জীবন এবং পরবর্তী সময়ে মায়ের একাধিক বিয়ের কারণে সে চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। তার দাবি, বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে সে মামার বাড়িতে অত্যন্ত অবহেলা ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। এই শৈশবের অপূর্ণতা এবং মায়ের প্রতি জমে থাকা এক তীব্র ঘৃণা ধীরে ধীরে তাকে এক হিংস্র মানসে পরিণত করেছিল। জনি মনে করত, তার জীবনের সকল ব্যর্থতা ও কষ্টের জন্য তার মা দায়ী। এই কুটিল মানসিকতা থেকেই সে তার মাকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৭ জুন জনি তার মা মজিদা বেগমকে ছেংগারচর বাজার এলাকা থেকে কৌশলে অটোরিকশাযোগে নিয়ে যায় কলাকান্দা ইউনিয়নের ওই নির্জন কলাবাগানে। বাগানটি জনশূন্য এবং দুর্গম হওয়ায় সেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটানো জনির জন্য সহজতর ছিল। বাগানের দুই আইলের মাঝখানে জমে থাকা পানিতে মাকে ফেলে দিয়ে জনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শ্বাসরোধ করে তার প্রাণবায়ু বের করে নেয়। মায়ের আর্তনাদ বা বাঁচার আকুতির প্রতি সে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখায়নি। হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার পর সে মায়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি দূরে একটি পুকুরে ফেলে দেয়, যাতে কেউ তাদের কোনো যোগসূত্র খুঁজে না পায়। এরপর সে তার স্বাভাবিক কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে নিজেকে এমনভাবে আড়াল করার চেষ্টা করে যেন কিছুই ঘটেনি।
পুলিশের তদন্ত দল যখন মাঠে নামে, তখন তাদের সামনে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা কোনো ক্লু ছিল না। সম্পূর্ণ ক্লুলেস একটি মামলাকে সমাধান করতে গিয়ে পুলিশকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে লোকেশন বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা ছিল তদন্তের মূল ভিত্তি। এক পর্যায়ে জনির গতিবিধি এবং তার কর্মকাণ্ডের অসংলগ্নতা পুলিশকে নিশ্চিত করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাইরের কেউ নয়, বরং পরিবারেরই কোনো সদস্য জড়িত। গ্রেপ্তারের পর জনির স্বীকারোক্তি ও তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত এবং পুকুরে ফেলে দেওয়া মায়ের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে, যা এই মামলায় শক্তিশালী সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে।
মতলব উত্তর থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, এই মামলার রহস্য উন্মোচন করা ছিল পুলিশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। যদিও জনি তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে, তবুও মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, সহকারী পুলিশ সুপার জাবীর হুসনাইন সানীব মন্তব্য করেছেন যে, এটি ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং মামলা। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঘাতক ছেলেকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। পারিবারিক ভাঙন, অবহেলা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সঠিক পরিচর্যার অভাব যে কতটা ভয়ংকর পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, জনি ও মজিদা বেগমের এই ঘটনা তার এক জীবন্ত দলিল। যে মা সন্তানকে তিল তিল করে বড় করার স্বপ্ন দেখেন, সেই সন্তান যখন মায়ের ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন তা মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার কাঠামোর দৃঢ়তা এবং মানসিক সম্পর্কের নিবিড়তা প্রয়োজন। জনি এখন পুলিশের হেফাজতে থাকলেও, এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষত সমাজদেহে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকবে। আইনের শাসন যেন এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে, সেটিই এখন স্থানীয় সচেতন মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষ যখন তার মানবিক বোধ ও বিবেক হারিয়ে ফেলে, তখন সে দানবের রূপ ধারণ করে। মা-সন্তানের সম্পর্কে যে ভালোবাসা ও মমতার ধারা থাকার কথা, সেখানে ঘৃণার বিষবাষ্প প্রবেশ করায় আজ এক মর্মান্তিক পরিণতির সাক্ষী হলো পুরো দেশ। অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি পাবে, কিন্তু একটি ভাঙা পরিবার ও অকালে ঝরে যাওয়া মায়ের জীবন ফিরে আসবে না। আমাদের সমাজকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সাফল্য যেমন প্রশংসাযোগ্য, তেমনই সমাজ থেকে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ নির্মূলে প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা আজ অপরিহার্য।