যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমাতে আশার আলো: ওয়াশিংটন সংলাপে ইতিবাচক বার্তা পেল বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫
  • ৭৮ বার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তৃতীয় দফার বাণিজ্য সংলাপের শুরুতেই বাংলাদেশের জন্য খুলে গেল সম্ভাবনার জানালা। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকের প্রথম দিনেই পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অগ্রগতি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি সাম্প্রতিক শুল্ক সংকট নিরসনের দিকেও একটি বড় পদক্ষেপ।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান মঙ্গলবার সকালে ওয়াশিংটন থেকে এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে জানান, “যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (USTR) কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানো হবে। আমাদের শুল্ক যথেষ্ট হারে কমবে, যদিও নির্দিষ্ট হার এখনই বলা যাচ্ছে না। আজ এবং আগামীকাল এ বিষয়ে আরও আলোচনা চলবে।”

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের একটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতসহ দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন সহকারী ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ব্রেন্ডন লিঞ্চ, যিনি বাণিজ্য ও শুল্ক নীতিমালার অন্যতম নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত।

এই সংলাপটি এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরোপিত সম্ভাব্য পাল্টা শুল্ক ৩৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে ১ আগস্ট থেকে। যদিও চলতি বছরের ২ এপ্রিল প্রথম এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়, এরপর ৯ এপ্রিল তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ৮ জুলাই নতুন ঘোষণা আসে, যেখানে স্পষ্ট করা হয়—নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে আগস্টের শুরু থেকেই।

এর আগে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যে গড়ে ১৫.৫ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হতো। নতুন হার অনুযায়ী তা বেড়ে ২২ থেকে ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে সেটি সরাসরি ৩৫ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে, যা দেশের তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য বড় এক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কৌশলগত ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। এরই অংশ হিসেবে গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশদ ‘অবস্থানপত্র’ পাঠানো হয়, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয় যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শুল্ক হার আরোপ একদিকে অযৌক্তিক, অন্যদিকে বৈষম্যমূলক।

অবস্থানপত্রে বাংলাদেশের অন্যতম যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম—প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনামের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১২৩ বিলিয়ন ডলার হলেও তাদের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক হার মাত্র ২০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত হার ৩৫ শতাংশ, যা কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছে ঢাকা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শুল্ক সংকট শুধু বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের মতো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে বিবেচিত। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাকেই ভোগাবে।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সুনাম, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের সক্ষমতা এই আলোচনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের আগে যে মনোযোগ ও প্রস্তুতির পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে গঠনমূলক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে, আগামী দিনের বৈঠকগুলোতে যদি স্পষ্ট কোনো ছাড় পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু শুল্ক সংকট নিরসনেই নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি নতুন ধারা সূচিত করতে পারে। সংলাপ শেষে যৌথ বিবৃতি বা সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।

এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—বাংলাদেশ কতটা শুল্ক ছাড় পায় এবং তা কত দ্রুত কার্যকর হয়। তবে সংলাপের শুরুতেই পাওয়া এই সবুজ সংকেত দেশের রপ্তানি খাতের জন্য এক স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, এই ইতিবাচকতা বাস্তবসম্মত নীতিগত অগ্রগতিতে পরিণত হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হয়ে উঠবে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com