প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবল মাঠে ভাগ্য যেন সারাক্ষণ পরীক্ষা নেয় তারকাদের। বৃহস্পতিবার বস্টনের গ্যালারি ভরা দর্শকদের সামনে ঠিক তেমনই এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছিলেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে মরক্কোর জমাট বাঁধা রক্ষণের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়ে মাঠের বিশাল গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ফরাসি সমর্থককে হতাশায় ডুবিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের বৈশিষ্ট্যই হলো ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো। বিরতির পর সেই আক্ষেপের রেশ কাটিয়ে এমবাপ্পে এমন এক মহাকাব্যিক গোল করলেন, যা কেবল ফ্রান্সকে সেমিফাইনালের পথই দেখায়নি, বরং ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে এক নতুন ইতিহাস।
ম্যাচের ৬০তম মিনিটের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এখন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে বল পাওয়ার পর মরক্কোর অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ইসা জিওপকে বোকা বানিয়ে যে বিদ্যুৎগতির শটটি এমবাপ্পে নিয়েছিলেন, তা ছিল শিল্পের চূড়ান্ত নিদর্শন। বাঁকানো শটটি পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই বস্টনের স্টেডিয়াম যেন উত্তাল সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এই একটি গোল এমবাপ্পেকে নিয়ে গেছে এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো অধিকাংশ ফুটবলারের কাছে স্বপ্নের মতো। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল তার অষ্টম গোল এবং এর আগে দুটি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এবারের আসরে তার গোল-সম্পৃক্ততা দাঁড়ালো ১০টিতে।
ফুটবল পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ২৭ বছর বয়সী এই ফরাসি ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অনন্য ও বিরল কীর্তি গড়েছেন। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনি টানা দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত ১০টি করে গোলে সরাসরি অবদান রাখার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও তিনি আটটি গোল করেছিলেন এবং দুটি অ্যাসিস্ট দিয়ে দলকে চূড়ান্ত সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। টানা দুই বিশ্বকাপে এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রমাণ করে, এমবাপ্পে কেবল বর্তমান সময়ের সেরা নন, তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নক্ষত্র হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ব্যক্তিগত মাইলফলকের হিসেবেও তিনি ছাড়িয়ে গেছেন অনেক কিংবদন্তিকে। বিশ্বকাপে মাত্র ২০টি ম্যাচ খেলেই ২০টি গোল করার এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান এখন তার নামের পাশে। তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায়, সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির সমান ২১টি গোল করতে যেখানে ৩১টি ম্যাচ খেলার প্রয়োজন হয়েছিল, সেখানে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ও ম্যাচের অনুপাত অভাবনীয়। গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং খেলার মাঠের বিচক্ষণতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই সাফল্যের পেছনে তার কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে এমবাপ্পে এখন পূর্ণ ছন্দে রয়েছেন। আটটি গোল নিয়ে তিনি এখন তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তার সমসংখ্যক গোল নিয়ে ঠিক পেছনেই রয়েছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসি। এই দুই মহাতারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথ এবারের বিশ্বকাপকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফুটবলের এই নন্দনতাত্ত্বিক লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এখন তুমুল কৌতূহল ও উন্মাদনা বিরাজ করছে। এমবাপ্পে যেভাবে মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাতে সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের মঞ্চে তার পা থেকে আরও জাদুকরী মুহূর্ত দেখার প্রত্যাশা করছেন সমর্থকরা।
মরক্কোর বিরুদ্ধে এই জয় ফ্রান্সের জন্য কেবল সেমিফাইনালে উত্তরণ নয়, বরং এটি তাদের মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলল। পেনাল্টি মিসের মতো কঠিন মানসিক চাপের মুহূর্ত থেকে ফিরে এসে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া এমবাপ্পের নেতৃত্বের গুণাবলিও ফুটে উঠেছে এই ম্যাচে। মাঠের সাধারণ খেলোয়াড় থেকে একজন প্রকৃত নেতার ভূমিকায় নিজেকে যেভাবে মানিয়ে নিয়েছেন, তা তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ফ্রান্সের ডাগআউট থেকে শুরু করে মাঠের প্রতিটি খেলোয়াড় যেন তার এই জয়ের নেশায় নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়েছে।
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। বস্টনের এই ম্যাচে এমবাপ্পের প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি শট এবং গোল উদ্যাপনের প্রতিটি ভঙ্গি যেন সেই আবেগকেই উসকে দিয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন দেশপ্রেম আর ব্যক্তিগত অর্জনের লড়াই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখনই জন্ম নেয় রূপকথা। এমবাপ্পে বর্তমান বিশ্বকাপের সেই রূপকথার প্রধান নায়ক। তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। আগামী সেমিফাইনালে ফ্রান্স কার মুখোমুখি হবে তা নিয়ে সমীকরণ চললেও, এমবাপ্পের বর্তমান ফর্ম যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই জয় ফ্রান্সের কোচ ও ফুটবল ফেডারেশনের জন্য নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছে। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতে এমবাপ্পে যদি তার এই ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে ফ্রান্সের টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণে কোনো বাধা থাকবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বস্টনের সেই রাতে এমবাপ্পে শুধু গোল করেননি, তিনি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন গেঁথে নিয়েছেন। ইতিহাস যখন তার এই সাফল্যের হিসাব লিখবে, তখন এই পেনাল্টি মিসের হতাশা আর তার পরের সেই রূপকথার গোলটি সোনালী হরফে লেখা থাকবে।