জ্বালানি ভর্তুকির বিশাল বোঝায় সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
জ্বালানি ভর্তুকির বিশাল বোঝায় সরকার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মারাত্মক প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

এর বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর। দেশের জ্বালানি আমদানির সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল। ফলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে।

বিগত দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্রদান করে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১০০ টাকায় নামিয়ে আনার আন্তরিক চেষ্টা চালালেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকায় উন্নীত করতে হয়। দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের এই মূল্যই এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।

এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতি ও বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি কোনোমতে পুষিয়ে নিতে বিপিসির পক্ষ থেকে সরকারের জ্বালানি বিভাগের কাছে বারবার ভর্তুকির আবেদন জানানো হয়েছে। বিপিসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরে জ্বালানি খাতের চলমান ক্ষতি সামাল দিতে ভর্তুকি চেয়ে জ্বালানি বিভাগের কাছে ইতিমধ্যেই পাঁচ দফায় লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে চতুর্থ দফার চিঠির সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে। তবে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না ঘটে বরং অবনতি হওয়ায় পরবর্তীতে গত ২৩ জুন পর্যন্ত চার মাসের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে আরও একটি নতুন ও বিস্তারিত চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ গত জুলাই মাসের দ্বিতীয় দিনে তিন মাসের জন্য সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় এবং পঞ্চম চিঠিটি সুনির্দিষ্ট বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়া হয়। সরকারের ওপর ভর্তুকির এই অসহনীয় চাপ কোনোমতে সামাল দিতে বিপিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প যেমন ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ এর বাস্তবায়ন, ঢাকা-চট্টগ্রাম এসপিএম এবং জেট অয়েল পাইপলাইন নির্মাণের জন্য পূর্বে সংরক্ষিত তহবিল থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা তুলে এনে বর্তমানে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কোনোমতে স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।

তবে দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এবং সরকার এই ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য যেকোনো মুহূর্তে আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ বিপিসির এই ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির পুরো বিষয়টির ওপর অত্যন্ত নিবিড় নজর রাখছে এবং এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিপিসির দায়িত্বশীল পরিচালক ও যুগ্মসচিব নাজনীন পারভীন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান অস্থির মূল্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসেই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাঠানো হয় এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করে মন্ত্রণালয়ই তেলের মূল্য নির্ধারণের চূড়ান্ত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের যে চরম ও অস্বাভাবিক মূল্য বিরাজ করছে, তাতে শুধু সীমিত পরিসরে ভর্তুকি দিয়ে সরকারের পক্ষে এই বিশাল ও পর্বতপ্রমাণ আর্থিক বোঝা বহন করা অত্যন্ত দুরূহ ও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সরাসরি দেশের পরিবহন খাতের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এর ফলে দেশের যেকোনো পণ্য পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বহুগুণ বেড়ে যায়। পরিবহনে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ভাড়া আদায় করার মোক্ষম অজুহাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও মারাত্মকভাবে উসকে দেয়।

এদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের জ্বালানি আমদানিতে ইতিমধ্যে প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে বলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার অভিজাত চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই উদ্বেগের কথা জানান।

মন্ত্রী গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন যে বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় যেভাবে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও খরচ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত, ভয়াবহ ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে দেশের উদীয়মান ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প ও বৃহৎ উৎপাদন খাত আজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতির মারাত্মক ও জাঁতাকল—এই দুইয়ের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পড়ে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক চরম ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশের জ্বালানি খাতের এই নজিরবিহীন সংকট উত্তরণে সরকারের সুদূরপ্রসারি, সময়োপযোগী ও অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৌশল বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ও অপরিহার্য দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত