প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অত্যন্ত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতে বিগত মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় একশ জন মার্কিন সেনাসদস্য গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বা সাবেক টুইটারে প্রকাশিত পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিশেষ সহকারী শন পার্নেল স্বাক্ষরিত এক সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং ইউএসএ টুডের বিশদ প্রতিবেদনে এই সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র এবং পেন্টাগনের এই স্বীকারোক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। সুদূর আরব সাগর থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর ইরানের ধারাবাহিক ও ক্ষিপ্র পাল্টা আক্রমণের ফলে সৃষ্ট এই হতাহতের ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশ্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন এক উদ্বেগের ঝড় তুলেছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল তার বিবপ্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিগত সাতই জুলাই থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় একশ জন মার্কিন সেনাসদস্য ইরানের সঙ্গে চলা এই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষে কোনো না কোনো মাত্রায় শারীরিক আঘাত বা ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, এই আহত সেনাসদস্যদের একটি বিশাল ও বড় অংশ মূলত সামান্য মস্তিষ্কের আঘাত বা কনকাশনে ভুগেছেন এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পেন্টাগনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে আহত মোট সেনাসদস্যদের প্রায় ছিয়ানব্বই শতাংশ সদস্যই এরই মধ্যে তাদের নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গায় পুনর্নিযুক্ত হয়েছেন এবং লড়াইয়ে ফিরে গেছেন। তা সত্ত্বেও মার্কিন সেনাদের ওপর এই ধরনের আঘাত হানা হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কী ধরনের কৌশল বা অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে এবং কীভাবে এই সেনারা আহত হলেন, সেই বিষয়ে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে পেন্টাগন কর্তৃক সেনাসদস্যদের হতাহতের এই তথ্য প্রকাশ করার ঠিক আগেই আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে পেন্টাগন ইচ্ছাকৃতভাবে ডজনডজন মার্কিন সেনার আহত হওয়ার চাঞ্চল্যকর খবরগুলো সাধারণ জনগণের কাছ থেকে গোপন বা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ইরানের সামরিক বাহিনীর লাগাতার ও তীব্র হামলায় মার্কিন বাহিনীর যে ধরনের বড় মাপের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার প্রকৃত চিত্র মার্কিন প্রশাসন জনগণের সামনে আনতে ভয় পাচ্ছে। এই প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক্সে দেওয়া পৃথক পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন যে, আহত সেনাসদস্যদের সঠিক সংখ্যা বা তথ্য লুকিয়ে রাখার এই ধরনের সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষমূলক অভিযোগ যুদ্ধ মন্ত্রণালয় বা প্রতিরক্ষা বিভাগ সর্বৈবভাবে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসের কিছু নির্দিষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট লেখকের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কালিমালিপ্ত ও হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে এই ধরনের মিথ্যাচার করার কঠোর অভিযোগ এনেছেন।
পেন্টাগনের এই তীব্র ক্ষোভ ও প্রত্যাখ্যানের জবাবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সরকারি মুখপাত্র ড্যানিয়েল রোডস হা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তাদের সংবাদমাধ্যম প্রকাশিত সংবাদের শতভাগ নির্ভুলতা ও সত্যতার ব্যাপারে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী এবং তাদের নিবিড় অনুসন্ধানে এটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের বেশ কয়েকটি আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হামলার ফলে সৃষ্ট প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই পেন্টাগন জনসাধারণের আড়ালে রেখেছে। ড্যানিয়েল রোডস হা আরও উল্লেখ করেন যে, তাদের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রশাসনেরই অত্যন্ত দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তার গোপন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা চলমান এই সংবেদনশীল সামরিক অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে এই সত্যগুলো জানিয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরে থাকা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এই ধরনের তথ্য প্রকাশ করাকে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন যে, এটি দেশের সাধারণ জনগণকে তাদের সরকার এবং প্রতিরক্ষা বিভাগ কীভাবে কাজ পরিচালনা করছে তা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।
ইরানের সঙ্গে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আহত হওয়ার এই সর্বশেষ ও রোমহর্ষক পরিসংখ্যান এমন এক অতি সংবেদনশীল সময়ে প্রকাশ্যে এল, যার ঠিক আগের দিনই পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জর্ডানে অবস্থিত একটি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও দুজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার মর্মান্তিক সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে যখন দুই দেশের মধ্যে এই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়, তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে আসছে ইরান ও তাদের মিত্র বাহিনীগুলো। জর্ডানে নিহত হওয়া সর্বশেষ দুই সেনার মৃত্যুর ফলে চলতি যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরাসরি সংঘাতে নিহত মার্কিন সামরিক সদস্যের সর্বমোট সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে সতেরো জনে। গত উনিশ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে উপস্থিত সংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্ডানে নিহত হওয়া ওই দুই সাহসী সেনার কথা গভীর শোকের সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাদের আত্মত্যাগের কথা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সে সময় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন যে, নিহত ওই মহান ব্যক্তিব্রেদ ও দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন যাতে ইরান কোনো অবস্থাতেই বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ানো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে। নিহত দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করে তিনি জানান যে তাদের একজন হলেন হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের ইভা বিচের বাসিন্দা পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং অপরজন হলেন টেক্সাসের ক্যারলটনের বাসিন্দা মাত্র উনিশ বছর বয়সী তরুণ প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস। এই দুই তরুণ সেনার মর্মান্তিক মৃত্যু এবং একই সঙ্গে প্রায় একশ সেনার আহত হওয়ার ঘটনা মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে পেন্টাগনের তথ্য গোপন করার অভিযোগ এবং অন্যদিকে ইরানের শক্তিশালী সামরিক প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলার মুখে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার এই লড়াই আগামী দিনে কোন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, সেদিকেই এখন সারাবিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।